বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬

কুমিল্লায় প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের বুক চিরে সড়ক! ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা, ১৮ ফুটে সম্প্রসারণের উদ্যোগ

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

Rising Cumilla - Road cuts right through primary school playground in Cumilla
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের কামারখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়/ছবি: প্রতিনিধি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের কামারখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠের মাঝ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে পাকা সড়ক। প্রায় ৭৫ ফুট দীর্ঘ ও ১০ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত সড়কটি বিদ্যালয়ের মাঠকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। প্রতিদিন এ পথে যানবাহন চলাচল করায় ২৫২ শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের সাথে রয়েছে ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, জামে মসজিদ ও খানকা।সামাজিক সভা, মাহফিল, ঈদগাহ ও জানাজার মতো বিভিন্ন আয়োজনেও বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মাঠের মাঝ দিয়ে সড়ক থাকায় পুরো মাঠ একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারি নকশা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের মাঠের বাইরে রাস্তার জায়গা থাকার পরও প্রায় দুই যুগ আগে বিদ্যালয়ের মাঠের ভেতর দিয়ে রাস্তা নেওয়া হয়। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় , প্রথমে সাময়িক বিকল্প পথ হিসেবে বিদ্যালয়ের জমি ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে সেটিই পাকা সড়কে পরিণত হয়ে স্থায়ীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখন সেই সড়কটি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পক্ষ থেকে সড়ক সম্প্রসারণের জন্য সার্ভে চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত হতে পারে। এতে বিদ্যালয়ের মাঠের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাধব চন্দ্র বণিক সড়ক সরিয়ে নিতে ১০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনটি ৭১৩ নম্বর স্মারকে লিপিবদ্ধ হয়। এছাড়াও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ২৭ এপ্রিল ২০২৫ বিদ্যালয়ের জমি ও সরকারি নকশা অনুযায়ী রাস্তার অবস্থান নির্ধারণে সার্ভেয়ারের মাধ্যমে পরিমাপের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করা হয়। ২৯ জুলাই ২০২৫ উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার সায়েলা শারমিন ও চেইনম্যান নাজমুল হক সরেজমিনে বিদ্যালয়ের জমি ও রাস্তা পরিমাপ করেন বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রাস্তা সরানো হয়নি।

১২ জুন ২০২৫ দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে রাস্তা সরিয়ে সরকারি নকশা অনুযায়ী রাস্তা নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান।

সিদ্ধান্তটি লিখিতভাবে উপস্থাপনের পর উপস্থিত ব্যক্তিরা গণস্বাক্ষর করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জমা দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেব জানান, সরকারি নকশা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের উত্তর পাশ দিয়ে রাস্তা চলাচলের ব্যবস্থা ছিল। সাম্পুরা বাড়ির কবরস্থানের পশ্চিম-উত্তর কোণ থেকে বর্তমান কামারখোলা ঈদগাহ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ফটক বরাবর ওই রাস্তার অবস্থান ছিল।সাম্পুরা বাড়ির পুকুরের উত্তর পাড়সংলগ্ন পুরোনো রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে পথচারী ও যানবাহনের চলাচলের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের জমির ওপর দিয়ে বিকল্পভাবে চলাচল শুরু হয়। পরে সেই বিকল্প পথ আর সরানো হয়নি।

কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম বলেন, “জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়ে থাকলে ইউএনওকে বলা হবে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য। ইউএনও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ও স্থানীয়দের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, “বিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে যাওয়ায় কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে এলজিইডিকে রাস্তা সরানোর ব্যাপারে অবহিত করেছি।”

চান্দিনা উপজেলা প্রকৌশলী গোলাম উল্লাহ বলেন, “তাদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। আমরা সড়ক সম্প্রসারণের কাজের জন্য সার্ভে করছি। ১৮ ফুট প্রস্থ হবে। মাঠের মাঝে ১৮ ফুট সড়ক গেলে ভোগান্তি আরও বাড়বে। আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করে রাস্তাটি কীভাবে দক্ষিণ পাশের ভবন ভেঙে নেওয়া যায়, সেটি দেখছি।”

এদিকে, সড়কের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ৩৯ শতাংশ জমির মালিকানা ও নামজারি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দলিল থাকলেও ৩৯ শতাংশ জমির পুরোটা বিদ্যালয়ের নামে নামজারি হয়নি। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ জমি নামজারি করার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি।

অন্যদিকে বাকি ২৩ শতাংশ জমি আলী আকবর ও আ. মতিন গংয়ের নামে রয়েছে বলে বিদ্যালয় সূত্রে দাবি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের নামে ওই পরিমাণ সম্পত্তি নেই।তাদের নামীয় সম্পত্তির পরিমাণ ৩ শতাংশ। বিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশনের সময় জমির পরিমাণ দেখাতে অনিয়ম বা প্রতারণা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের একাংশের দাবি।

এছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলমের পরিবার বিদ্যালয়ের নামে জমি দান করলেও ওই সম্পত্তির প্রায় ০.৩০ শতাংশ জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর দুই ভাইয়ের নামে লিপিবদ্ধ রয়েছে বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভুলবশত দান করা জমির কিয়দংশ আমাদের নামে হয়েছে।আমি দাখিলা কেটেছি।স্কুলের জমি স্কুলকে ফিরিয়ে দেব।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাধব চন্দ্র বণিক বলেন, সরকারি নকশা, ভূমির রেকর্ড ও সরেজমিন বাস্তবতা যাচাই করে এমন একটি সমাধান করা হোক, যাতে জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা থাকে কিন্তু ২৫২ শিশুর একমাত্র খেলার মাঠটি সড়কের চাপে আরও সংকুচিত না হয়।
রাস্তা প্রয়োজন, কিন্তু শিশুদের নিরাপদ মাঠও প্রয়োজন।আর বিদ্যালয়ের নতুন কমিটি গঠন হলে জমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হবে।

Pc.চান্দিনার কামারখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখান দিয়ে রাস্তা

আরও পড়ুন