
একটি নিষ্পাপ শিশুর নিথর, রক্তাক্ত দেহের সামনে দাঁড়িয়ে যখন একজন হতভাগ্য বাবা বলেন, “আমি আমার সন্তানের বিচার চাই না, আমি বিচার পাব না”—তখন বুঝতে হবে শুধু একটি শিশুই মারা যায়নি, বরং নির্মমভাবে খুন হয়েছে একটি রাষ্ট্রের বিবেক, একটি সমাজের ন্যূনতম মানবিক বিশ্বাস। গত ১৯ মে ঢাকার মিরপুর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছোট্ট কোমলমতি শিশু রামিসা এক পাষণ্ডের হাতে যেভাবে নির্মম নির্যাতন, ধর্ষণ ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো, তা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক মানবিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ। যে বয়সে ওর হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন পেন্সিল, ছবি আঁকার খাতা আর খেলার পুতুল, সেই বয়সে ওকে সাদা চাদরে মোড়ানো লাশ হয়ে চিরতরে বিদায় নিতে হলো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে।
রামিসার বাবার সেই বুকফাটানো আক্ষেপ আর চরম হতাশার বাণী আজ আমাদের পুরো সমাজকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। একজন বাবার এই অবিশ্বাস কিন্তু একদিনে কিংবা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত দিনে এই দেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর আইনের দীর্ঘসূত্রতাই আজ একজন সাধারণ নাগরিককে এতটা অসহায় করে তুলেছে যে, তিনি নিজের কলিজার টুকরো সন্তানের হত্যার বিচার চাওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন।
আজকের বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রামিসার এই নির্মম হত্যাকাণ্ড একটি জ্বলন্ত ক্ষত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বিবেকবান মানুষ আজ এই ঘটনায় স্তব্ধ, ক্ষুব্ধ ও চরমভাবে মর্মাহত। এই আধুনিক ইন্টারনেটের যুগে পুরো পৃথিবী যখন রামিসার জন্য কাঁদছে, যখন ভার্চুয়াল জগৎ প্রতিবাদের ঝড়ে উত্তাল, তখন আমাদের বুক ভেঙে যায় এই ভেবে যে, আমরা কেমন এক সমাজ বিনির্মাণ করছি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য? প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে চোখ রাখলেই গা শিউরে ওঠে, রক্তের দাগে রঞ্জিত হয়ে যায় আমাদের চোখ। খুন, খারাপি, রাহাজানি আর ধর্ষণের এক পৈশাচিক উৎসব যেন চলছে চারদিকে।
সবচেয়ে ভয়াবহ, লজ্জাজনক এবং বেদনার বিষয় হলো, এই চরম নির্মমতার শিকার হচ্ছে অবুঝ ও সুরক্ষাহীন শিশুরা। যেসব শিশু প্রতিনিয়ত এমন পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগের বয়স মাত্র ৬ থেকে ১০ বছর, কিংবা তারও নিচে। যারা ভালো-মন্দের তফাতটুকুও বোঝে না, যারা জীবনের আলো ফোটার আগেই অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই নিষ্পাপ ফুলগুলোকে ছিঁড়ে ফেলার এই আদিম ও বিকৃত উল্লাস কোনো সভ্য দেশের পরিচয় হতে পারে না। কোনো কল্যাণকর, প্রগতিশীল রাষ্ট্রে এমন নারকীয় দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না।
রামিসার শোকার্ত ও বুকভাঙা মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে তাদের বাসায় ছুটে গিয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে সেই শোকসন্তপ্ত পরিবারকে বুকে টেনে নিয়েছেন, তাদের চোখের জল মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং বিচারের বাণী শুনিয়েছেন। একই সাথে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আশ্বাস দিয়েছেন যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জঘন্য অপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করা হবে এবং অপরাধীকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক উপস্থিতি এবং আশ্বাস হয়তো রামিসার মা-বাবার ভেঙে যাওয়া মনে সামান্য আশার আলো জোগায়, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের মনের ভেতরের গভীর সংশয় ও দীর্ঘদিনের জমে থাকা অবিশ্বাসকে পুরোপুরি দূর করতে পারে না। কারণ, অতীতেও এমন অনেক আশার বাণী, অনেক প্রতিশ্রুতি এ দেশের মানুষ শুনেছে, কিন্তু দিনশেষে সেই বাণীগুলো আদালতের অন্ধকার বারান্দায় ধুলোবালি মেখে বছরের পর বছর পড়ে থেকেছে।
এ দেশের মানুষ গভীর ক্ষোভের সাথে দেখেছে, বিগত সরকারের আমলে কীভাবে একের পর এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের বিচার ফাইলবন্দী হয়ে হিমঘরে হারিয়ে গেছে। যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যার রহস্য আজো উন্মোচিত হয়নি, থমকে আছে তার বিচার প্রক্রিয়া।
কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের মতো সুরক্ষিত এলাকায় খুন হওয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মা আজো বিচারের আশায় পথ চেয়ে চেয়ে চোখের জল ফেলছেন, যার দীর্ঘশ্বাস আজো বাংলার আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তোলে। হাদি হত্যাকাণ্ডের মতো আরও অসংখ্য লোমহর্ষক মামলার ফাইল কোর্টের অন্ধকার কোণে পড়ে আছে। মামলার পর মামলা চলমান থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে, আইনি মারপ্যাঁচে কেবলই কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দিন গুনতে গুনতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ক্ষয়ে যায় তাদের জীবন। কবে কখন এসব জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ সম্পূর্ণ হবে, তা আজ কেবল ওপরওয়ালাই ভালো জানেন।
এই দীর্ঘমেয়াদী বিচারহীনতা, আইনি ফাঁকফোকর আর ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়াই মূলত অপরাধীদের মনে এক ধরণের অভয় অরণ্য তৈরি করে দেয়। যখন একজন খুনি, ধর্ষক বা পৈশাচিক মানসিকতার ব্যক্তি দেখে যে এত বড় অপরাধ করার পরও বছরের পর বছর সে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারছে, কিংবা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন অন্যান্য অপরাধীদের সাহস আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। আজ দেশে অপরাধের মাত্রা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার একমাত্র কারণ হলো স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়া। আইনের শাসন যদি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অপরাধীদের দমনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।
যদি এই সমস্ত জঘন্য ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যেত, যদি অপরাধীকে জনসমক্ষে যথোপযুক্ত এবং কঠোরতম সাজা দেওয়া নিশ্চিত করা যেত, তবে আর কোনো পাষণ্ড কোনো শিশুর দিকে কুনজরে তাকানোর সাহস পেত না। অপরাধের গ্রাফ নিমেষেই নেমে আসত শূন্যের কোঠায় এবং সমাজে ফিরে আসত শান্তি ও শৃঙ্খলা।
একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, সার্বভৌম ও নিরাপদ হয়ে ওঠে, যখন তার সবচেয়ে দুর্বল, অবুঝ ও নিরীহ নাগরিকটি—একটি শিশু—সেখানে পূর্ণ নিরাপদে বড় হতে পারে। রামিসার বাবার সেই অশ্রুসিক্ত সন্দেহ এবং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি তীব্র অনাস্থা দূর করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন বর্তমান সরকারের ওপর ন্যস্ত। সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে, তা ভাঙার এখনই উপযুক্ত সময়।
সরকারের কাছে, দেশের বিচার বিভাগের কাছে আজ কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আকুল মিনতি ও জোর দাবি, রামিসা হত্যার বিচার যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে না যায়, কালক্ষেপণের চিরচেনা ছকে যেন এই রক্তের দাগ মুছে না যায়। এই মামলার রায় যেন এ দেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো নিঃস্ব বাবাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে না হয় যে তিনি তার সন্তানের হত্যার বিচার পাবেন না।
এই পৈশাচিক অপরাধের দ্রুততম বিচার ও অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তিই কেবল পারে রামিসার অতৃপ্ত ও ব্যথিত আত্মাকে চিরশান্তি দিতে এবং তার শোকে পাথর হয়ে যাওয়া মা-বাবার তপ্ত বুকে সামান্যতম স্বস্তির প্রলেপ এনে দিতে। আসুন, আমরা আর কোনো রামিসাকে এভাবে অকালে ঝরে যেতে না দিই, বিচারহীনতার অন্ধকার সংস্কৃতি থেকে এই প্রিয় স্বদেশকে মুক্ত করে আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট










