
এইতো কদিন আগেই শ্রমিক দিবস গেল। প্রতি বছর পহেলা মে এলেই এদেশের একটি বিশেষ শ্রেণির ভেতর একধরনের তৎপরতা শুরু হয়। সভা-সেমিনারের আয়োজন হয়, বক্তৃতা হয়, শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ আলোচনা হয়।
এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য– এসব সভায় কিন্তু কোনো শ্রমিক থাকেনা। বরং যারা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন, তাদের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে বিশাল অট্টালিকায় আরামে জীবন কাটান, যাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা নিজের অধিকার আদায়ের জন্য নিয়মিত আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন- সেই মানুষগুলোই মঞ্চে বসে শ্রমিকের পক্ষে সওয়াল করেন।
আপনি যখন হাতের ধোঁয়া-ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রীমঙ্গলে বর্ষার কনকনে ভোরে ভিজতে ভিজতে চা পাতা তুলছেন এক শ্রমিক। বঞ্চিত শ্রমিকদের কথা বলতে গেলে চা শ্রমিকদের কথা সবার আগে আসে। ৮ ঘণ্টা একটানা কাজ করে তেইশ কেজি পাতা তোলার পর দিন শেষে তার হাতে ওঠে মাত্র ১৭৮ টাকা। যে বাজারে এক লিটার তেলের দাম দুইশো টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে একজন মানুষের সারাদিনের শ্রমের মূল্য ১৭৮ টাকা! এটি কি স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য এক নির্মম পরিহাস নয়?
১৮৪০-এর দশকে সিলেটে চা শিল্পের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল এই বঞ্চনার ইতিহাস। এখন ২০২৬ সাল। দেশ বদলেছে, শাসক বদলেছে, প্রযুক্তিতে এসেছে বিপ্লব। কিন্তু চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনে আধুনিক দাসত্বের শিকল আজও অটুট। সিলেটের মালনীছড়া থেকে শ্রীমঙ্গল– সর্বত্র শ্রমিকদের একটাই আক্ষেপ: “সময়ের সাথে শাসক বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু আমাদের কষ্ট কমে না।” বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের দিনের ন্যূনতম খাবার জোগাড় করতেই লাগে হাজার টাকার বেশি। অথচ মালিকপক্ষ রেশন, আবাসন আর উৎসব-ভাতার নানা হিসাব মিলিয়ে দাবি করছে, প্রতিটি শ্রমিক দিনে ৫৬০ টাকা পাচ্ছেন। বাস্তবে নগদ যা হাতে থাকে, তা দিয়ে এই মূল্যস্ফীতির বাজারে টিকে থাকা স্রেফ কল্পনা।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে বঞ্চনার ছবিটি আরও স্পষ্ট হয়। ভারতে একজন চা শ্রমিক দৈনিক ৩৪০ থেকে ৬৮০ টাকা মজুরি পান। চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কায়ও একজন শ্রমিক পান ৬৭০ টাকা। শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের চা শ্রমিকেরাই সবচেয়ে কম মজুরি পান। এমনকি দেশের ভেতরেও চিত্রটি সমান লজ্জার। বাংলাদেশের ৩১টি শিল্প খাতের মধ্যে সর্বনিম্ন মজুরি এই চা শিল্পেই। এত কম মজুরিতে আর কোনো খাতের শ্রমিককে কাজ করতে হয় না। বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিক বা সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে যতটা তৎপরতা দেখা যায়, চা শ্রমিকদের বেলায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। ২০২৩ সালের গেজেট আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে – শ্রমিকের, নাকি মালিকের মুনাফার? এই প্রশ্ন এখন আর এড়ানোর উপায় নেই।
বৈষম্যের এই ছবি আরও গভীর হয় যখন দেখা যায়, একই বাগানে কাজ করেও সবাই সমান মজুরি পান না। সমান কাজে সমান মজুরির আইন থাকলেও চা বাগানে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ক্যাটাগরি করে ভিন্ন ভিন্ন হারে মজুরি দেওয়া হচ্ছে। আর অস্থায়ী শ্রমিকেরা পাচ্ছেন স্থায়ী শ্রমিকদের চেয়েও কম। অনেকে দৈনিক ১২০ টাকারও নিচে। চুক্তিতে সমান মজুরির কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে সেই নিয়ম মানা হয় না। আইনের এই নির্লজ্জ লঙ্ঘন বছরের পর বছর ধরে চলছে, অথচ জবাবদিহি নেই কারো।
এর বাইরেও শ্রমিকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ রয়েছে- তাদের ভূমি। কয়েক পুরুষ ধরে যে জমিতে ঘাম ঝরিয়ে এসেছেন, উন্নয়নের নামে সেই জমি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা এখন তাদের মনে গেঁড়ে বসেছে। চা শ্রমিকদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা মানে তাদের অস্তিত্বের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
তারা আজ দৈনিক ১০০০ টাকা মজুরি আর ১৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধির দাবি করছেন। একে অতিরিক্ত চাওয়া ভাবার কোনো সুযোগ নেই — এটি একজন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম দাবি। রাষ্ট্র যখন স্মার্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন চা বাগানে এই আধুনিক দাসত্ব টিকিয়ে রাখা আমাদের জন্য গভীর লজ্জার।
শ্রমিকের পেটে ক্ষুধা রেখে যে চায়ের কাপে আমরা চুমুক দিই, সেই চায়ের স্বাদ কখনো মিষ্টি হতে পারে না। ১৭০ বছরের এই বঞ্চনার অবসান এখন সময়ের দাবি। চা শ্রমিকদের ভিক্ষা নয়, চাই প্রকৃত নাগরিক মর্যাদা। তাদের এই লড়াই কেবল টাকার নয়, এটি সম্মানের লড়াই। রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো শিল্প দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমরা কি পারব আমাদের চায়ের কাপের চুমুকটাকে বঞ্চনামুক্ত করতে?









