
ভারতের ইন্টারনেট দুনিয়ায় মাত্র চার দিন আগে জন্ম নেওয়া একটি সাধারণ ট্রোল বা কৌতুক এখন দেশটির মূলধারার রাজনীতিতেও বড় ধরনের আলোড়ন তুলেছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই মিমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে ইনস্টাগ্রামে ১ কোটি ২০ লাখ ফলোয়ার অর্জন করেছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল ফলোয়ার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) দেশটির গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস এ তথ্য জানিয়েছে।
নিজেদের রসাত্মকভাবে ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে দাবি করা এই ‘সিজেপি’ বা তেলাপোকা দলের পক্ষে এখন ভারতের শীর্ষ বিরোধী দলীয় নেতারাও প্রকাশ্য সমর্থন জানাচ্ছেন।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। দেশের বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ এবং ‘পরজীবী’র সাথে তুলনা করে তিনি বলেছিলেন, কিছু তরুণ আছে, ঠিক তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি পায় না বা পেশাগত কোনো জায়গা তৈরি করতে পারে না। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া, কেউ আরটিআই (তথ্য অধিকার) কর্মী বা অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে এবং সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের পরই ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে অভিজিৎ দিপকে নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘সিজেপি’ গঠন করেন। ইন্টারনেটের পরিহাস ও মিম কালচার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন বেকারত্ব, প্রশ্নফাঁস ও মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত ভারতীয় যুবসমাজের প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
‘বিজেপি বনাম সিজেপি’: একাত্মতা প্রকাশ করছেন বিরোধী হেভিওয়েটরা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং হতে থাকা এই মিম আন্দোলনে এবার সরাসরি যোগ দিয়েছেন ভারতের জাতীয় স্তরের শীর্ষ বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা।
সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে ছোট একটি পোস্টে তিনি এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, এবার লড়াই হবে বিজেপি বনাম সিজেপি। তার এই এক লাইনের পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
ইনস্টাগ্রামে এক ভিডিও বার্তায় দিল্লির সাবেক উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টি নেতা মনীষ সিসোদিয়া বলেন, আমিও একজন তেলাপোকা। যখন লড়াইটা কুমির আর তেলাপোকার মধ্যে, তখন আমি গর্বের সাথে ককরোচ জনতা পার্টির পাশেই দাঁড়াচ্ছি।
লোকসভার সাংসদ তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, অ্যান্টি-ন্যাশনাল পার্টির কার্ডধারী সদস্য হওয়ার পাশাপাশি আমিও সিজেপি-তে যোগ দিতে চাই। সিজেপি তাকে স্বাগত জানিয়ে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ আখ্যা দেয়। অন্যদিকে, ভারতের ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার ও তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক রাজনীতিক কীর্তি আজাদও এই দলে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা জানতে চেয়ে পোস্ট করলে সিজেপি মিম মোডে উত্তর দেয়, ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ই এই দলে যোগ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বড় যোগ্যতা।
এছাড়া ভারতের অন্যতম শীর্ষ ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী এই ঘটনাকে ভারতীয় যুবসমাজের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে নিজে এই ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
সিজেপির ইশতেহার
যদিও এই দলটির পুরোটাই ব্যঙ্গ এবং মিম-ভিত্তিক, তবুও তাদের রসাত্মক পোস্টগুলোর আড়ালে ভারতের তরুণদের বাস্তব দাবিদাওয়া এবং ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ ফুটে উঠেছে।
তাদের ইশতেহারের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভারতের প্রধান বিচারপতিদের অবসরের পর কোনো রাজ্যসভার আসন বা সরকারি পদ দেওয়া যাবে না। বৈধ ভোট বাতিলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দলত্যাগী ও সুবিধাবাদী বিধায়ক-সাংসদদের নির্বাচনে আজীবন নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। মূলধারার গণমাধ্যমের ভুয়া খবর এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের জন্য আরও বেশি আসন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিম, ব্যঙ্গচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে গড়ে ওঠা এই নতুন ধারা ভারতের তরুণ ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, অনলাইনভিত্তিক এই ‘তেলাপোকা আন্দোলন’ ভবিষ্যতের ভারতীয় রাজনীতিতে কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।









