
এ দেশের গ্রামগুলো আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষক, জেলে, তাঁতি,দিন মজুর পল্লীর আপামর জনতার মৌলিক পেশা। তাদের ঘামে এ দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। তবে এই গ্রামীণ জনপদ এখনো উন্নয়নের দিক থেকে অনেকাংশে অবহেলিত। সেই বাস্তবতা বদলে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে কুমিল্লার ময়নামতির লাল মাটির পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)। সবুজ বনায়ন ঘেরা বিস্তীর্ণ এ জায়গায় প্রতিদিন পদচারণা করেন দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষার্থী ও উন্নয়নকর্মীরা। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিক্ষা ও গবেষণার বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয়ে বার্ড দেশের গ্রামীণ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বার্ডের যাত্রা শুরু যে ভাবে :
‘৪৭ পরবর্তী পূর্ব বাংলা দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার অন্যতম চিত্র। কৃষি ছিল প্রথাগত, উৎপাদন কম ছিল। আর সামাজিক সংগঠনের ধারণা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। এ বাস্তবতা নাড়া দেয় উন্নয়ন চিন্তাবিদ ড. আখতার হামিদ খানকে। সে সময় ড. আখতার হামিদ খান চিন্তা করেছেন শুধু সরকারি প্রশাসনের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ থাকালালীন গ্রামীণ সমাজের দারিদ্র্য কৃষকদের সমস্যা এবং উন্নয়নের ঘাটতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য তাঁর উদ্যোগে ১৯৫৯ সালের ২৭ মে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘Comilla Rural Academy’। পরে ‘Bangladesh Academy for Rural Development’ (BARD) নামে পরিচিতি পায়।
বার্ডের কার্যক্রম সমূহ:
বার্ড গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক মডেল উদ্ভাবন করে আসছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়নসহ সমাজ উন্নয়নমূলক নানা ক্ষেত্রে এসব মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে তা জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং উন্নয়নকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত চার ও ছয় মাস মেয়াদী বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্স এবং দুই মাস মেয়াদী বিশেষ বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্স গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর প্রায় ১৫০টি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনার মাধ্যমে বার্ড দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা, প্রকল্প প্রণয়ন, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন এবং সরকারকে নীতি নির্ধারণে সহায়তা প্রদান বার্ডের অন্যতম কাজ। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বার্ডে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অজর্নের সুযোগ পায়।
বার্ডে ইন্টার্ন করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পড়ুয়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী বৃষ্টি আচার্য্য। তিনি বলেন, “কুমিল্লার ময়নামতি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়। বরং এটি আমার জন্য ছিল জ্ঞানের এক উন্মুক্ত পাঠশালা। এখানে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার সময় আমি গবেষণার তাত্ত্বিক দিকগুলোর বাস্তব প্রয়োগ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। ”
তিনি আরও বলেন,”বার্ডের কৃষি ও পরিবেশ বিভাগের অধীনে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে গ্রামীণ সমবায়, ক্ষুদ্রঋণ, যুবকল্যান, নারী ক্ষমতায়ন ও গ্রামীন উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছি। অভিজ্ঞ মেন্টরদের অধীনে তথ্য সংগ্রহ, ডেটা বিশ্লেষণ এবং পদ্ধতিগত রিপোর্ট তৈরির মাধ্যমে আমার পেশাদার দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো বুঝতে পারা ছিল এই ইন্টার্নশিপের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আরেক শিক্ষার্থী দিনেশ বসু চাকমা। বার্ড থেকে তি ইন্টার্ন করেছেন। তিনি বলেন,”বার্ডে ইন্টার্নের মাধ্যমে আমার একাডেমিক জীবনে শেখা কিছু বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছি। এর পাশাপাশি গবেষণায় প্রশ্ন তৈরি করা, ডাটা কালেকশন কীভাবে করতে হয়, কীভাবে ডাটা বিশ্লেষণ করতে হয় তা শিখতে পেরেছি এবং একটি গবেষণায় প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে বাস্তবিক ধারণা পেয়েছি। ”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পড়ুয়া আসাদুজ্জামান নুর বলেন, “বার্ডে কাজ শেখার বেশ সুযোগ রয়েছে। কেউ গবেষণা করতে চাইলে সে গবেষণা করতে পারে। আবার কেউ মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারে। আর আমি গবেষণা করছি বাল্যবিবাহ নিয়ে।”
নুসরাত মাহি নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন,”বার্ডে ইন্টার্ন করে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। একজন মেন্টরের অধীনে থাকায় সবকিছুতেই সংশোধন আসছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ, গবেষণা, সেমিনার এগুলো আমরা স্বস্তঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি। এতে করে আমরা নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন কিছুর সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। যা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সহায়ক হবে।”
কুমিল্লা বার্ডের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক আইরীন পারভিন বলেন, “বার্ড ষাট বছ ধরে পল্লীর উন্নয়নে কাজ করছে। বার্ড উদ্ভাবিত বিভিন্ন মডেল সারা দেশে বাস্তবায়িত হয়েছে। যা পল্লী এলাকার মানুষের জীবন মান উন্নয়নে অবদান রাখছে। বার্ডের কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে দেশে তরুণ প্রজন্মকে পল্লী উন্নয়ন সংযুক্তি কর্মসূচি, অবহিতকরণ কার্যক্রম ও ইন্টার্নশিপ প্রদানের মাধ্যমে গ্রামের সমস্যা সম্পর্কে জানা এবং পল্লীর উন্নয়নে তাদের আগ্রহী করে তোলা। বার্ড বছরে প্রায় ১৭০০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রায় ৫০ জনকে ইন্টার্নশিপ প্রদান করে থাকে। আমার বিশ্বাস বার্ডের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীগণ গ্রামকে নিবিরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পায় এবং ভবিষ্যতে তারা পল্লীর উন্নয়নে অবদান রাখতে উৎসাহী হবে।”
তিনি আরও বলেন,”ময়নামতির লাল মাটির বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বার্ড শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের এক জীবন্ত প্রতীক। এখানে প্রতিদিনই বোনা হয় নতুন স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নই বদলে দেয় গ্রামীণ মানুষের জীবন।”
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।










