সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬

রাতভর বৃষ্টিতে অচল কুমিল্লা নগরী, বেশি বিপাকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

RisingCumilla - Comilla city brought to a standstill by overnight rain; HSC examinees face the most trouble.
রাতভর বৃষ্টিতে অচল কুমিল্লা নগরী, বেশি বিপাকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা/ছবি: সংগৃহীত

মাত্র তিন ঘণ্টায় রেকর্ড ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে কুমিল্লা নগরীতে। সোমবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল চত্বর ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার।

কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মোট ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ। দিনভর আরও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

ভারী বর্ষণে নগরীর জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইনস, রেসকোর্স, উত্তর রেসকোর্স, মনোহরপুর, মহিলা কলেজ রোড, বাগানবাড়ি, দক্ষিণ চর্থা, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর ও শহরতলির ছায়াবিতান এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নিচু স্থাপনায় পানি ঢুকে পড়ে। ড্রেন উপচে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। অনেকেই নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হিমশিম খান। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের সামনে পানি জমে যাওয়ায় কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে নৌকায় করে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়।

পরীক্ষার্থী সাদিয়া রহমান বলেন, “বাসা থেকে অনেক আগে বের হয়েছিলাম। কিন্তু পুরো শহর পানির নিচে থাকায় কেন্দ্রে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছে। ভিজে কাপড়েই পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে হয়েছে।”

আরেক পরীক্ষার্থী নাঈম ইসলাম বলেন, “রাস্তায় এত পানি ছিল যে কয়েকবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তারপরও পরীক্ষা দিতে পেরে স্বস্তি লাগছে।”

এদিকে ছেলেকে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পৌঁছে দিতে গিয়ে জলাবদ্ধতার মধ্যে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। পরে বাবা-ছেলে মিলে গাড়ি ঠেলে নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নগরীর দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

নগরীর ঠাকুরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, “এবারের বর্ষায় তৃতীয়বারের মতো ঘরে পানি ঢুকেছে। রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর—সব জায়গায় পানি। ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম কষ্টে আছি।”

সদর হাসপাতাল সড়কের ব্যবসায়ী রাশেদুল হাসান জানান, “জীবনে প্রথমবার দোকানের ভেতরে এত পানি দেখলাম। মালামাল সরাতে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।”

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। জরুরি বিভাগের সামনেও পানি জমে থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থায় চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

জলাবদ্ধতার সুযোগে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া অনেক এলাকায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। উপায় না পেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হন যাত্রীরা।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহসান পারভেজ জানান, ভারী বর্ষণের কারণে বিলম্বে কেন্দ্রে পৌঁছানো পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে কেন্দ্রসচিবদের সহানুভূতিশীল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই তিনি সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অবস্থান করে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কাজ করছেন।

আরও পড়ুন