
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আলোচিত নর্তকী ও গুপ্তচর মাতা হারির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ইতিহাস। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও শত্রুপক্ষের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে এ কৌশল ব্যবহার করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তবে প্রযুক্তির আধুনিক যুগে সেই কৌশল আর শুধু গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকেও নানা কৌশলে ফাঁদে ফেলছে সাইবার প্রতারকরা।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সচেতন থাকলে এই ধরনের প্রতারণার অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। অল্প দিনের পরিচয়েই কোনো অপরিচিত ব্যক্তি যদি অস্বাভাবিক মাত্রায় আবেগ, ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করতে শুরু করেন, তাহলে সতর্ক হওয়া জরুরি। সম্পর্কের স্বাভাবিক গতির তুলনায় অতিরিক্ত আবেগ দেখানোর এই কৌশলকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘লাভ বম্বিং’ বলা হয়।
প্রতারকরা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় ছবি ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে। কিন্তু সরাসরি ভিডিও কলে আসার ক্ষেত্রে নানা অজুহাত দেখায়। কখনো আগে থেকে ধারণ করা ভিডিও, আবার কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করেও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করা হয়।
সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর প্রতারকরা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। শিকারের পেশা, আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত দুর্বলতা কিংবা একাকিত্বের মতো তথ্য জেনে নেওয়া হয়। সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এটিই ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ কৌশল।
পরবর্তীতে সম্পর্ক কিছুটা ঘনিষ্ঠ হলে গোপনে স্ক্রিন রেকর্ড করে অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদানে চাপ দেওয়া হতে পারে। এসব ছবি বা ভিডিও পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতারকরা। এরপর পরিবারের কারও অসুস্থতা, আইনি জটিলতা কিংবা জরুরি আর্থিক প্রয়োজনের কথা বলে অর্থ দাবি করা হয়।
কীভাবে বুঝবেন আপনি হানি ট্র্যাপের শিকার হতে পারেন
অপরিচিত কারও অস্বাভাবিক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা, অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশ, ভিডিও কলে আসতে বারবার অজুহাত দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য জানার প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ—এসবকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টের ছবি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে যাচাই করা যেতে পারে। কারণ অনেক প্রতারক ইন্টারনেট থেকে মডেল, তারকা কিংবা অন্য দেশের মানুষের ছবি সংগ্রহ করে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের রিয়েল-টাইম লোকেশন, ভ্রমণের পরিকল্পনা, আর্থিক অবস্থা বা অন্যান্য স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামনাসামনি পরিচয় হয়নি—এমন কারও অনুরোধে কোনো অবস্থাতেই অর্থ পাঠানো উচিত নয়। একইভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ ইন্টারনেটে একবার কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে সেটি পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব।
ব্ল্যাকমেলের শিকার হলে কী করবেন
ইতিমধ্যে কেউ ব্ল্যাকমেলের শিকার হলে সামাজিক সম্মানের ভয়ে প্রতারকের দাবি মেনে টাকা দেওয়া উচিত নয়। এতে সাধারণত সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে প্রতারকের দাবি আরও বাড়তে পারে।
ভয়ে চ্যাট হিস্ট্রি, লেনদেনের তথ্য বা অন্যান্য প্রমাণ মুছে ফেলা যাবে না। বরং কথোপকথনের স্ক্রিনশট, প্রোফাইলের তথ্য, ফোন নম্বর, লেনদেনের রেকর্ড এবং পাঠানো বা পাওয়া ফাইল সংরক্ষণ করতে হবে।
প্রতারকের সঙ্গে তর্ক, দর-কষাকষি বা কোনো ধরনের আপস না করে যোগাযোগ বন্ধ করে অ্যাকাউন্টটি ব্লক করা উচিত। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট ইউনিট এবং নারীদের জন্য পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (PCSW)-এর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নির্দেশনাতেও অপরিচিত অনলাইন পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রতারণার শিকার হলে প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: ইউএস ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC), এফবিআই ইন্টারনেট ক্রাইম কমপ্লেইন্ট সেন্টার (IC3), বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার অপরাধবিষয়ক নিরাপত্তা পরামর্শ এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা নির্দেশনা।










