সোমবার ৩১ আগস্ট, ২০২৬

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে পারে ইন্টারনেট সেবায়

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - Internet services.
ছবি: সংগৃহীত

দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ইন্টারনেট সেবাতেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন।

সোমবার (৩১ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ইন্টারনেট এখন আর মানুষের বিলাসিতা নয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণমাধ্যম, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো এটি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, ডেটা সেন্টার, আইআইজি, আইএসপি, মোবাইল টাওয়ার ও অন্যান্য ডিজিটাল অবকাঠামো ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

তিনি বলেন, একটি মোবাইল টাওয়ার বা ইন্টারনেট অবকাঠামো বিদ্যুৎ ছাড়া দীর্ঘ সময় সচল রাখা কঠিন। অনেক স্থানে বিকল্প হিসেবে ব্যাটারি ও জেনারেটরের ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বিভ্রাটে এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত। জেনারেটর চালাতে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট একসঙ্গে চললে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।

সংগঠনটির সভাপতি আরও বলেন, এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু বাসাবাড়ির রাউটার বন্ধ হয় না, স্থানীয় নেটওয়ার্ক, অপটিক্যাল ফাইবারের সক্রিয় যন্ত্রপাতি, মোবাইল টাওয়ার, ব্যাকহল নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন ডিজিটাল অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে গ্রাহক সংযোগ পেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি ও স্থিতিশীলতা পাচ্ছেন না।

ইন্টারনেটের ধীরগতির জন্য শুধু মোবাইল অপারেটর বা আইএসপির ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ইন্টারনেট সেবার মান সরাসরি সম্পর্কিত। তাই ইন্টারনেট অবকাঠামোকে অত্যাবশ্যকীয় সেবা হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং, অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন থেকে শুরু করে সরকারি ডিজিটাল সেবা—সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হলে এর অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

মহিউদ্দিন আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে ‘ডিজিটাল সংকট’ও যুক্ত হতে পারে। তখন মোবাইল ফোনে কল করা, মোবাইল ডেটা ব্যবহার কিংবা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের মতো সাধারণ সেবাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি, জনজীবন ও ডিজিটাল নিরাপত্তায়।

যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি 

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

দাবিসমূহ হলো-

১। ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

২। মোবাইল টাওয়ার, আইআইজি, আইএসপি, ডেটা সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর ব্যাকআপ পাওয়ার সক্ষমতা পর্যালোচনা করা।

৩। দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় টেলিযোগাযোগ খাতে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।

৪। জেনারেটর ও ডিজেলনির্ভর ব্যাকআপ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।

৫। বিটিআরসি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ এবং টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের সমন্বয়ে ‘টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট জরুরি অবকাঠামো সুরক্ষা পরিকল্পনা’ গ্রহণ করা।

৬। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কোন কোন এলাকায় মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হতে পারে, সে বিষয়ে গ্রাহকদের আগাম তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

৭। জ্বালানি সংকটের কারণে ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন ঘটলে গ্রাহকের ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনায় নেওয়া।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা চাই না বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশকে আবার ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে হোক। বর্তমানে ইন্টারনেট একটি মৌলিক নাগরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। তাই জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনায় ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ খাতকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পের সমস্যা হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে যুক্ত পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর পরবর্তী ভুক্তভোগী হতে পারে দেশের ইন্টারনেট সেবা এবং এর সঙ্গে যুক্ত কোটি কোটি গ্রাহক।

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন