রবিবার ৩০ আগস্ট, ২০২৬

আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না: রাষ্ট্রপতি

রাইজিং কুমিল্লা প্রতিবেদক

Rising Cumilla - No more mothers will have to shed tears for their children, nor wives for their husbands- President
আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না: রাষ্ট্রপতি/ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না এবং গুমের শিকার পরিবারের স্বজনদের আর দীর্ঘ অপেক্ষা ও চোখের পানি ফেলতে হবে না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬। আজ এমন এক দিন, যা আমাদের বুকফাটা হাহাকার ও তীব্র বেদনার অতল গহ্বরে নিয়ে যায়।’ এ সময় তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার সব মানুষকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর দুর্বিষহ অপেক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনেরা প্রিয়জন ফিরে আসার আশায় অপেক্ষা করেছেন। অনেক স্ত্রী স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছেন। আবার অনেক সন্তানের শৈশব কেটে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেওয়া হয় না, তার সঙ্গে একটি পরিবারের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বও বিপর্যস্ত হয়। এটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়েছে।

গত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল। অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে এবং অনেককে গোপনে হত্যা করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম ও বন্দিত্বের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন, তবে দেশে এখনও এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যারা গুম হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছেন, স্বাধীনতার পর সেই দেশেই গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভয় ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন বাংলাদেশেই এসব অপরাধের বিচার হবে।

তিনি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে এসব বর্বর কর্মকাণ্ড করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

সবশেষে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’

তিনি আরও বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।

আরও পড়ুন