
সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও প্রবাসী কর্মীদের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময়কালে তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী ও প্রবাসী কর্মীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা, সম্ভাবনা ও বিভিন্ন সমস্যার কথা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন প্রস্তাব দেন তারা।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে অর্থনৈতিক কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সিঙ্গাপুর বড় বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কেন্দ্র হওয়ায় বাংলাদেশে দেশটির বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা বাংলাদেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য একটি পৃথক উইং গঠন করা হয়েছে। জনশক্তি অভিবাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এই উইং কাজ করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) খাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেন। নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তুলতে গবেষণা, উদ্ভাবন ও যথাযথ নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
পাট ও পাটজাত পণ্যকে সিঙ্গাপুরের বাজারে সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের লাভজনক বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে।
এ সময় বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়ে একটি যৌথ বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর চেম্বার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এ ধরনের যৌথ চেম্বার দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মতবিনিময়ে ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ খাত হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হলে এর সম্ভাব্য সুফল নিয়েও আলোচনা হয়।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানান, এফটিএ হলে ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সিঙ্গাপুরের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শনে রোডশো আয়োজনের প্রস্তাবও দেন তারা।
সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যবসায়িক কর্মশালা ও বাণিজ্য মেলা আয়োজনেরও প্রস্তাব দেন ব্যবসায়ীরা।
পরে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, জাহাজ নির্মাণশ্রমিক, সেবা খাতের কর্মী, লজিস্টিকস ও পরিবহনকর্মী, নির্মাণশ্রমিক এবং তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
এ সময় প্রবাসী কর্মীরা সিঙ্গাপুরে বয়স্কদের পরিচর্যাকারী হিসেবে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। এ খাতে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবও দেন তারা।
অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের হাসপাতালগুলোর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) সহযোগিতা চালুর প্রস্তাব দেন। তারা জানান, সিঙ্গাপুরের তুলনায় কম খরচে বাংলাদেশে কিছু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। কয়েকটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অংশগ্রহণকারীরা।
প্রাক্তন প্রবাসী কর্মীদের বাংলাদেশে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত করা এবং সিঙ্গাপুরে ওয়ার্ক পারমিটধারীদের জন্য সাশ্রয়ী প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে কর্মীদের হয়রানি, শোষণ ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার বহুমুখী করার ওপরও গুরুত্ব দেন। নির্মাণ ও লজিস্টিকসের মতো প্রচলিত খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো দক্ষতাভিত্তিক খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরামর্শ দেন তারা।
শামা ওবায়েদ বলেন, সরকার টিভিইটি খাতের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের সব দেশের বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ উন্মুক্ত। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদেরও দেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে দেখার আহ্বান জানান।
অংশগ্রহণকারীদের আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাব ও সমস্যাগুলো লিখিতভাবে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে সরকার কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।










