সোমবার ৩ আগস্ট, ২০২৬

বক ও পানকৌড়ির নিরাপদ আবাস কুমিল্লার দীর্ঘভূমি গ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

RisingCumilla - The Heron and the Cormorant
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি গ্রাম। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষ হয়ে বিকেলের আলো ফিকে হতে না হতেই বদলে যায় পুরো গ্রামের চিত্র। চারদিকের আকাশ ভরে ওঠে শত শত সাদা বক ও পানকৌড়ির উড়াউড়িতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল তেঁতুল, কড়ই, রেইনট্রি ও বাঁশঝাড়ের গাছগুলো সাদা-কালো পাখির সমাবেশে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।

প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও সাধারণ দর্শনার্থীরা। পাখিদের সম্মিলিত ডানার ঝাপটানি আর কোলাহলে গ্রামের শান্ত পরিবেশ রূপ নেয় এক অনন্য প্রাকৃতিক উৎসবে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দীর্ঘভূমি গ্রামের কয়েকটি পুরোনো বড় গাছ এখন বক ও পানকৌড়ির নিরাপদ আবাসস্থল। দিনের বেলায় খাবারের সন্ধানে বিভিন্ন বিল, জলাশয় ও ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়লেও বিকেলের শেষ ভাগে ঝাঁকে ঝাঁকে তারা আবার ফিরে আসে নিজ নিজ বাসায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, একের পর এক পাখি গাছে এসে বসছে। কোথাও মা পাখি ছানাকে খাবার খাওয়াচ্ছে, কোথাও আবার এক ডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে খেলায় মেতে উঠছে। মুহূর্তেই প্রতিটি ডাল ও পাতার ফাঁক ভরে যায় অসংখ্য পাখিতে। এমন দৃশ্য দেখতে থেমে যান পথচারীরাও।

স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর ধরেই বর্ষা মৌসুমের শুরুতে এসব পাখি এখানে আসে। নিরাপদ পরিবেশ, পুরোনো বৃক্ষ এবং আশপাশে পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা থাকায় প্রতিবছর একই এলাকায় ফিরে আসে তারা। প্রজনন শেষে মৌসুম শেষ হলে আবার অন্যত্র চলে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন বিকেলে পাখিগুলো ফিরে আসার দৃশ্য এখন আমাদের গ্রামের পরিচয় হয়ে উঠেছে। আগে শুধু গ্রামের মানুষ দেখলেও এখন অনেক দূর থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন। আমরা চাই এই পরিবেশ সবসময় নিরাপদ থাকুক।”

প্রকৃতিপ্রেমী শাহীন আহমেদ বলেন, “একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক বক ও পানকৌড়িকে আকাশে উড়তে দেখা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি। এটি শুধু দর্শনীয় নয়, আমাদের এলাকার জীববৈচিত্র্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও এগিয়ে এসে এই আবাসস্থল রক্ষা করা উচিত।”

স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, “প্রকৃতির প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ বাড়াতে এমন পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখানে এলে তারা বইয়ের বাইরে বাস্তব জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানতে পারে। তাই এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”

স্থানীয় যুবক নাসির উদ্দিন বলেন, “আমরা কয়েকজন মিলে নিয়মিত খেয়াল রাখি যাতে কেউ পাখি শিকার না করে বা তাদের বিরক্ত না করে। পাখিগুলো নিরাপদ থাকলেই আগামী বছরও তারা আবার ফিরে আসবে।”

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পাখিপ্রেমী ডা: মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা বলেন, “বক ও পানকৌড়ির মতো বন্য পাখি আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের নিরাপদ আবাস সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। পাখিদের অযথা স্পর্শ করা বা বিরক্ত করা উচিত নয়। তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে দূর থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করাই উত্তম।”

তিনি আরও বলেন, ‘একই সাথে এলাকাটি পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পাখির বিষ্ঠা জমে থাকলে যথাযথভাবে পরিষ্কার করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব। প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই আমাদের এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে।’

স্থানীয়দের মতে, সচেতনতা বাড়ানো, পুরোনো গাছ সংরক্ষণ এবং পাখিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা গেলে দীর্ঘভূমি গ্রাম ভবিষ্যতে কুমিল্লার অন্যতম প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে আরও পরিচিতি পাবে। প্রতিদিনের এই বক ও পানকৌড়ির মিলনমেলা শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদেরই নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাছে।

আরও পড়ুন