শুক্রবার ১৭ জুলাই, ২০২৬

ছোটবেলায় কুমিল্লায় থাকা হয়েছে শবনম ফারিয়ার, প্রতিদিন হাঁটতে যেতেন গোমতী নদীর পাড়ে

বিনোদন ডেস্ক

RisingCumilla - Sabnam Faria
শবনম ফারিয়া/ছবি: ফেসবুক

ছোটপর্দা ও বড়পর্দার খুব পরিচিত মুখ অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া। অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি বেশ সক্রিয়। ব্যক্তিগত জীবন, ক্যারিয়ার ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত মতামত প্রকাশ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে বাবাকে নিয়ে আবেগঘন পোস্টে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শবনম ফারিয়া।

রাইজিং কুমিল্লার পাঠকদের জন্য শবনম ফারিয়ার ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হল:

ক্লাস এইটে ওঠার পর হঠাৎ করেই কার্টুন আর গেমস বাদ দিয়ে বই পড়া শুরু করি। যদিও এই অভ্যাসটা আমার মধ্যে আসুক, সেটাই বাবা সবসময় চাইতেন।

কিন্তু আমি NFS 5, DX Ball, House of the Dead এর মতো গেমসে ভীষণ আসক্ত ছিলাম। যেহেতু বাবার পোস্টিংয়ের কারণে মফস্বলে বড় হয়েছি। তেমন বন্ধু-বান্ধব ছিল না, তাই আমার গেমসে আসক্তি নিয়ে বাবা-মা খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। কিন্তু বাবার মনে হতো, এটা খুবই ইউজলেস একটা কাজ। তার চেয়ে গানের রেওয়াজ করা , বাইরে খেলতে যাওয়া কিংবা বই পড়া অনেক ভালো।

আমাকে উৎসাহ দিতে ক্লাস থ্রি-ফোর থেকেই প্রতি সপ্তাহে চাচা চৌধুরী, বিল্লো, পিংকি, চান্নী চাচী এসব কমিকস কিনে দিতেন। কিন্তু কম্পিউটার কিনে দেওয়ার পর থেকে শুধু গেমসই জীবন।

যাই হোক, ক্লাস এইটে উঠে হুমায়ূন আহমেদ আর জাফর ইকবালের বই পড়া শুরু করলাম। কিন্তু এর মাঝেই কয়েকবার চুরি করে বাবার কালেকশন থেকে মাসুদ রানা পড়তে গিয়ে ধরা খেলাম। বাবা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “এখনও এই বই পড়ার সময় হয়নি। আরেকটু বড় হয়ে পড়বে”

কিন্তু আমি কি সেই মানুষ? কারো বাধা মানি! চুরি করেই পড়তে থাকলাম।

শেষ পর্যন্ত বাবা বুঝলেন, মানা করে লাভ নেই। তারপর কুমিল্লা থেকে এনে দিলেন কাকাবাবু, কালবেলা, কালপুরুষ, গর্ভধারিণী, বড়দিদি, মাধুকরী, দেবদাস, দূরবীন, প্রথম আলো, এমন আরও অনেক “বড়দের” বই।

বললেন, “বড়দের বই পড়ার এত শখ? তাহলে এগুলো পড়ো।”

প্রথমে বিরক্ত লাগলেও, পরে সেগুলোরই নেশা হয়ে গেল।

স্বপ্ন দেখলাম বড় হয়ে গর্ভধারিণীর জয়ীতা হবো!

একবার স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ি , স্কুল থেকে মারামারি করে বাসায় ফিরলাম।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “মার খেয়ে এসেছো, নাকি মেরে এসেছো?”

আমি বললাম, “মার খেয়েছি… তবে দিয়েছি বেশি।”

বাবা বললেন, “Very good. মার খেয়ে আসা যাবে না।”

ফলাফল? তিন দিন পর পলাশ নামে এক ছেলের মাথায় পেন্সিল ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। গার্ডিয়ান কল এলো,

বাবা সম্ভবত তখনই বুঝেছিলেন, আমাকে কথা খুব হিসেব করে বলতে হবে!

ফাদার্স ডে-তে বলেছিলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প আমার বাবার গল্প। আজ থেকে ঠিক নয় বছর আগে, এই দিনেই সেই গল্পটা শেষ হয়ে যায়।

সেদিনের পর থেকে আমার জীবন আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি। ডিপ্রেশন, ভুল সিদ্ধান্ত, জীবনের বন্ধুর পথে একা হাঁটা এসব শুধু কঠিন ছিল না, প্রায়সময়ই মনে হতো অসম্ভব।

গত নয় বছরে আমার মা, দুই বোন, দুলাভাইরা, ফুপা ফুপি, এমনকি আমার ভাগ্নেরাও বিভিন্ন সময়ে আমার জীবনে বাবার ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে আমার মা, আজও তাঁর সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেন, আমরা তিন বোন যেন বাবার অনুপস্থিতিটা অনুভব না করি। কিন্তু বাবা তো বাবাই। আর আমার বাবা… তিনি তো ইউনিক।

ছোটবেলায় বাবা অনেক বছর মুরাদনগরে থানা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ডাক্তার মানুষ। অফিসের পর প্রাইভেট রোগী দেখতেন। কিন্তু এত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন বিকেলে বাইকের সামনে বসিয়ে আমাকে গোমতীর পাড়ে হাঁটতে নিয়ে যেতেন। তখন নদীর পাড়টা বাঁধানো ছিল। ফেরার পথে দুই টাকার ভাজা বুট বা বাদাম কিনে দিতেন।

আমার এসএসসি গণিত পরীক্ষার দিন কাঁদতে কাঁদতে হল থেকে বের হলাম। একটা সরল অংক ভুল করে ফেলেছি।

বাইরে এসে দেখি বাবা চকবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

বললাম, “বাবা, ৮০ তো পাবো না।”

বাবা খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, “তো কী হয়েছে? ৭০ পাবা?”

বললাম, “হ্যাঁ, পাবো।”

তিনি হেসে বললেন, “তাহলে তো A পাবা। কান্নার কী আছে?”

সেদিন বিকেলে বাবা একটা ইগলুর আইসক্রিম কেক নিয়ে এলো, আমি ৭০ এর বেশি পাব, সেই আনন্দ উদযাপন করার জন্য।

আজ জীবনে যত বড় কঠিন সময়ই আসুক, নিজের পিঠ নিজেকেই চাপড়ে বলতে হয় “ব‍্যাপার না তৃপ্তি, তুমি পারবা।”

কিন্তু আমি না কখনো এভাবে পারতে চাইনি।

আমি সবসময় বাবার আদরের ছোট মেয়েটাই হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম, যার বাবা জানে, রাতে শুটিং থেকে ফিরে মেয়ে ফ্রিজ খুললে ডায়েট কোক খুঁজবে।

গাড়িতে কোনো সমস্যা হলে বলতে পারবে, “বাবা, দেখো তো গাড়িটার কী হয়েছে।”বাজারে নতুন কোনো ফল উঠলে বাবা সেটা নিয়ে আসবেন, কারণ “বছরের প্রথম” ফলটা একসঙ্গে টেস্ট করতে হয় যেটা ৯৯.৯৯% সময়েই খেতে খুব বাজে হতো।

দেখতে দেখতে নয় বছর কেটে গেল। এই নয় বছরে অর্থকষ্ট ছাড়া পৃথিবীতে যত রকম কষ্ট আছে, প্রায় সবকিছুর মধ্য দিয়েই আমি গিয়েছি।

অর্থকষ্টের মধ্যে পড়িনি এটাও বাবা-মারই অবদান। তাঁরা নিজেদের কষ্ট করে গেছেন, যেন আমরা তিন বোন ভালো থাকতে পারি।

তবুও প্রতিদিনই মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা আমি হারিয়ে ফেলেছি। সময় অনেক কিছু বদলে দেয়, মানুষকে বাঁচতে শিখিয়ে দেয়, কিন্তু বাবার জন্য অপেক্ষা করা, বাবাকে মিস করা, কিংবা কোনো ভালো খবর প্রথমে তাঁকেই বলতে ইচ্ছে করা… এগুলোর কোনো মেয়াদ শেষ হয় না। নয় বছর পরও না।

রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সাগিরা

আরও পড়ুন