
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অমর স্রষ্টা। মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। পাঁচ দশক পরও প্রেম, দ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের কবি নজরুলের সৃষ্টি বাঙালির চেতনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত হলেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমাত্রিক। কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সংগীতজ্ঞ হিসেবে অসংখ্য গান ও রাগ-রাগিণী সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কবিতা ও গান অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে আজও অনুপ্রাণিত করে।
১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমেদ এবং মা জাহেদা খাতুন। মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে তিনি যে বিপুল অবদান রেখে গেছেন, তা তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে সপরিবারে বাংলাদেশে আসেন নজরুল। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৪ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি দেয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং একই বছর একুশে পদকে ভূষিত করে।
নজরুলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় কুমিল্লা
নজরুলের জীবনের সঙ্গে কুমিল্লার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় প্রায় ১১ মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেন তিনি। এর মধ্যে মুরাদনগরের দৌলতপুরে প্রায় দুই মাস এবং কুমিল্লা নগরীতে প্রায় নয় মাস কাটান কবি।
কুমিল্লায় অবস্থানকালে তাঁর জীবনের প্রেম, বিরহ, সাহিত্য ও সংগীতচর্চার নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়। দৌলতপুরে নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং কুমিল্লা নগরীতে আশালতা সেনগুপ্তা দুলীর সঙ্গে পরিচয় ও পরবর্তী সময়ে বিয়ে—নজরুলের ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আশালতার নাম কবি দিয়েছিলেন ‘প্রমীলা’।
কুমিল্লার বিভিন্ন বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে আড্ডা দিতেন নজরুল। গান গাইতেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং লিখতেন নতুন গান ও কবিতা। গোমতী নদী, ধর্মসাগর, নানুয়া দীঘি, ঝাউতলা, রাজগঞ্জসহ নগরীর বিভিন্ন স্থান তাঁর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর রাজগঞ্জ বাজারে ব্রিটিশবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন কবি। পরের বছর ২৩ নভেম্বর কুমিল্লা শহরের ঝাউতলা সড়ক থেকে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কুমিল্লায় অবস্থানের সময়ই তাঁর রাজনৈতিক চেতনা, প্রেম, সংগীত ও সাহিত্যচর্চার নানা দিক আরও বিকশিত হয়।
কুমিল্লায় নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রমীলা দেবীর বাড়ি, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়, ঝাউতলা, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার, নানুয়া দীঘির পাড়, দারোগা বাড়ি, ইউছুফ স্কুল রোড, মহেশাঙ্গন, কুমিল্লা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন ও মাঠ, দক্ষিণ চর্থায় শচীন দেববর্মনের বাড়ি, নবাব বাড়ি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি, নজরুল এভিনিউ, কান্দিরপাড়, রানীর দীঘির পাড়, কুমিল্লা রেলস্টেশন, কোতোয়ালি থানা, কেন্দ্রীয় কারাগার এবং মুরাদনগরের দৌলতপুর।
কুমিল্লার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, কুমিল্লায় বিচরণের মধ্য দিয়েই কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে আরও বিকশিত হয়ে ওঠেন। নজরুলের সঙ্গে কুমিল্লার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর প্রেম, বিয়ে এবং প্রকাশ্যে সুরকার, গায়ক ও অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা কুমিল্লায়।
তিনি বলেন, কুমিল্লায় নজরুলের বহু স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। যে উদ্দেশ্যে নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, তার যথাযথ প্রতিফলন নেই। নজরুলকে নিয়ে এখানে নিয়মিত চর্চা ও গবেষণাও হচ্ছে না। সরকারি উদ্যোগে কবির নামে এখনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়নি। এসব বিষয়ে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা আয়োজন
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আজ ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও হামদ-নাতের আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দুই দিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হবে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘আমারে দেবো না ভুলিতে…’ শীর্ষক এই আয়োজনে নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান থাকছে।
এদিকে নজরুল একাডেমির উদ্যোগে রয়েছে তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি। আজ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন জাতীয় কবির সমাধিতে ফাতেহা পাঠ ও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বাদ জোহর সমাধিসংলগ্ন মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে মিলাদ মাহফিল। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মগবাজারের বেলালাবাদ কলোনিতে নজরুল একাডেমির ‘কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে’ আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। ২৯ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টায় একই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে তিন দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠান।
প্রেম, দ্রোহ, সাম্য ও মানবতার চেতনায় বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে সমৃদ্ধ করা নজরুল শারীরিকভাবে নেই পাঁচ দশক ধরে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনো অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগায়। কুমিল্লার সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে এই অমর কবির প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয় নজরুল গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।










