শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসে গভীর কূপ খনন, দিনে মিলতে পারে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - Deep well drilling in Titas, Brahmanbaria, 45 million cubic feet of gas could be yielded daily.
ছবি: সংগৃহীত

গ্যাস সংকটের মধ্যে নতুন আশার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন তিনটি কূপ খনন করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ। কূপগুলো থেকে আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কূপগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হলে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা এলএনজির ওপর চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বস্তি আসতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ৩১ নম্বর কূপের খননকাজ চলছে। ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতার এ কূপটি দেশের সবচেয়ে উচ্চচাপ ও উচ্চতাপসম্পন্ন অনুসন্ধান কূপ হিসেবে খনন করা হচ্ছে। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল খনন শুরু হওয়ার পর ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৬৩৭ মিটার গভীরতা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে।

বিজিএফসিএল আশা করছে, চলতি বছরেই ৩১ নম্বর কূপের খনন শেষ করে সেখান থেকে দৈনিক অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপ থেকে দৈনিক গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। পুরোনো কূপগুলোতে মজুদ ও চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমেছে। এ অবস্থায় উৎপাদন বাড়াতে ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ খননের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ২৯ ও ৩১ নম্বর কূপের খননকাজ চলছে। ২৯ নম্বর কূপের কাজ শেষ হলে একই রিগ ব্যবহার করে ৩০ নম্বর কূপের খনন শুরু করা হবে।

গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, খননকাজ সফলভাবে শেষ হলে তিনটি কূপ থেকে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ২৯ নম্বর কূপের কাজ আগামী দুই মাসের মধ্যে শেষ করার আশা রয়েছে। আর ৩১ নম্বর কূপের কাজ শেষ করতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে।

তিনি জানান, গভীরতা এবং উচ্চচাপ-উচ্চতাপের কারণে খননকাজে কারিগরি জটিলতা দেখা দিতে পারে। সব মিলিয়ে আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে তিনটি কূপের কাজ শেষ করার প্রত্যাশা রয়েছে।

মো. মাহমুদুল নবাব বলেন, তিতাসে এর আগে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় উচ্চচাপের স্তর পাওয়ার পর এর নিচে আর খনন করা হয়নি। এবার ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খননের মাধ্যমে গভীর স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

সিসমিক জরিপের ভিত্তিতে ওই এলাকায় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে তিনটি কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আশা করা হচ্ছে। এ গ্যাসের পরিমাণ দেশের মোট চাহিদার তুলনায় খুব বেশি না হলেও এতে এলএনজি আমদানির চাপ কমবে।

তিনি জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ টাকা। বিপরীতে আমদানি করা এলএনজির ক্ষেত্রে ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ফলে দৈনিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গেলে এলএনজি আমদানি কমানোর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

তিতাসের পাশাপাশি বিজিএফসিএলের অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়াতে বন্ধ কূপের ওয়ার্কওভার এবং নতুন কূপ খননের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ, কমেছে লোডশেডিং

এদিকে দেশে গ্যাস সরবরাহও কিছুটা বেড়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘদিনের সংকটের মধ্যে বুধবার বিকেল ৪টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এর আগে মঙ্গলবার রাত ৮টায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে ১ হাজার ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬০৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। সব মিলিয়ে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে সারা দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে।

গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। টার্মিনালের একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকের ওপর চাপ বাড়ে।

মেরামতের পর ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না থাকায় সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ হিসাবে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে গ্যাসের চাহিদা এখনও সরবরাহের তুলনায় বেশি। ফলে নিয়মিত এলএনজি কার্গো আমদানি নিশ্চিত না হলে সরবরাহে আবারও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ১৯৬৮ সালে এখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়।

আরও পড়ুন