
জাতীয় গ্রিডে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়ায় ফেনীতে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুর থেকে শুরু হওয়া সংকটে জেলার প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন অচল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার আবাসিক গ্রাহক।
চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় পরিবহন, শিল্প ও গৃহস্থালি—সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) ফেনী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
শুধু ফেনী জেলাতেই বিজিডিসিএলের প্রায় ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে ফেনী শহরে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। এছাড়া জেলার ১২টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, প্রায় ২৯টি শিল্পকারখানা এবং সাতটির মতো ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিটও সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাসাবাড়িতে রান্নাবান্নায় ভোগান্তি
ফেনী শহরের বিভিন্ন এলাকায় চুলায় গ্যাস না থাকায় স্বাভাবিক রান্নাবান্নায় ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার অতিরিক্ত দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনছেন।
নাজির রোডের বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, আগে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও বুধবার থেকে একেবারেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রান্নার জন্য সিলিন্ডার কিনেছেন তিনি। তার অভিযোগ, বাজারে ১ হাজার ৬০০ টাকার এলপিজি সিলিন্ডার এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
দাউদপুর এলাকার বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, গ্যাস না পেলেও মাস শেষে গ্রাহকদের নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস বিল স্থগিত বা মওকুফের ব্যবস্থা করা উচিত।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে। গ্যাসের চাপ না থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা।
নজির আহমেদ ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে মালিকের জমা ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরেক চালক আবদুল খালেক বলেন, গ্যাস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তারা।
অন্যদিকে, রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। রবিউল ইসলাম নামে এক পথচারীর অভিযোগ, সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু পরিবহন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।
কয়েক দিনেও সংকট কাটার শঙ্কা
স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বিপুল শর্মা বলেন, তাদের তিনটি স্টেশনে প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ হাজার ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বুধবার দুপুর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
বিজিডিসিএলের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের (FSRU) কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কমে গেছে। এর প্রভাবে বিজিডিসিএলের আওতাধীন কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং কোনো কোনো স্থানে সম্পূর্ণ শূন্য চাপ বিরাজ করছে।
গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
বিজিডিসিএল ফেনী কার্যালয়ের বিক্রয় শাখার ব্যবস্থাপক কিরণ শংকর পাল বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ না আসায় ফিলিং স্টেশনসহ প্রায় সব শ্রেণির গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ অব্যাহত থাকায় কিছু এলাকায় অতি সীমিত পরিসরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
সংস্থার সঞ্চালন বিভাগের ব্যবস্থাপক দেওয়ান মোস্তফা ইমরান বলেন, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণেই মূলত এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটি জাতীয় পর্যায়ের সংকট। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, এর আগেও গত সপ্তাহে টানা ছয় দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এর পর আবার দ্বিতীয় দফায় সংকট দেখা দেওয়ায় নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন ফেনীর বাসিন্দারা।










