
বিদ্যালয়ে সহিংসতা ও বুলিং প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করতে আজ দেশের ২০টি জেলার ২৭টি উপজেলার ৩০টি বিদ্যালয়ে একত্র হয়েছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। বিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নিরাপদ ও সহায়ক করে তুলতে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি এবং সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সাইবার বুলিংসহ বিদ্যালয়ে সহিংসতা ও বুলিং প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে এসব কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও সুস্থতা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন’।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সহযোগিতায় স্বাস্থ্য বান্ধব স্কুল (এইচপিএস) কর্মসূচির আওতায় এসব কার্যক্রমে সহায়তা করছে ইউনেস্কো ঢাকা।
সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি এই উদ্যোগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মানসিক সুস্থতা, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, সবার জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ এবং অনলাইন নিরাপত্তার ওপর।
নায়েম এর মহাপরিচালক প্রফেসর ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক বলেন, “সুস্থ জাতি গঠনে প্রশিক্ষিত শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এইচপিএস কর্মসূচির আওতায় শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে নায়েম। এতে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, নির্যাতন ও হয়রানি প্রতিরোধ, প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত সেবার সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা এবং মানসিক সংকটে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো থাকছে। বিদ্যালয়ে ছেলে বা মেয়ে বলে কোনো শিক্ষার্থী যেন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার না হয়, তা প্রতিরোধ ও মোকাবিলার বিষয়েও শিক্ষকদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে এসব সমস্যা বন্ধ করতে বিদ্যালয় ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাউশি ও নায়েমের তৈরি নির্দেশিকা অনুসরণ করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ তুলে ধরছেন। সহিংসতা ও বুলিং ঠেকাতে বিদ্যালয় এবং পরিবার একসঙ্গে কী করতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা করছেন তারা। ছেলে বা মেয়ে বলে কোনো শিক্ষার্থী যেন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এসব আলোচনায়। পাশাপাশি উঠে আসছে বুলিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধের বিষয়গুলো। শিক্ষার্থীরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, তা সরাসরি তাদের কাছ থেকেই শোনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও সহায়তাব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আনা দরকার, তা নিয়ে আলোচনা করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান ড. সুসান ভাইজ বলেন, “প্রতিটি শিশুর জন্য বিদ্যালয়, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ এবং অনলাইন, সব জায়গাই নিরাপদ হতে হবে। বুলিং মোকাবিলায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে যত্ন ও সহমর্মিতার এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে বুলিংয়ের ঘটনাই না ঘটে।”
ঢাকার কেরানীগঞ্জের আগানগর উচ্চবিদ্যালয়ে আলোচনায় ছাত্রীদের হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানান অংশগ্রহণকারীরা। নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার ও সন্তানদের অনলাইন সুরক্ষার বিষয়ে অভিভাবকদের আরও তথ্য ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন বলেও আলোচনায় উঠে আসে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুসনা আরা বেগম বলেন, “হয়রানি প্রতিরোধে এবং আমাদের বিদ্যালয়কে আরও নিরাপদ করতে আমরা ব্যবস্থা নেব। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার—শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও বৃহত্তর সমাজের।”
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বার্তা তুলে ধরা হয়। অন্যের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, অপমানজনক বার্তা পাঠানো থেকে বিরত থাকা, হয়রানির শিকার সহপাঠীর পাশে দাঁড়ানো এবং এমন ঘটনা ঘটলে বিশ্বস্ত শিক্ষক বা অভিভাবককে জানাতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজকে নিয়মিত একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানায়।
এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ৮ নভেম্বর ইউনেস্কো ঢাকার সহায়তায় শিক্ষকদের একটি অনলাইন সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হয়রানি, নির্যাতন ও সাইবার বুলিং নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরবেন শিক্ষকেরা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত করণীয় নিয়েও আলোচনা করবেন তাঁরা।
সংলাপগুলো থেকে পাওয়া মতামত বিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে কাজে লাগানো হবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে তৈরি এসব পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের হয়রানি, নির্যাতন ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণ করা হবে।
স্বাস্থ্য ও সুস্থতার চর্চাকে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলাই স্বাস্থ্য বান্ধব স্কুল কর্মসূচির লক্ষ্য। ইউনেস্কো-সমর্থিত এই বৈশ্বিক উদ্যোগে শিক্ষক ও বিদ্যালয়প্রধানদের দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবার ও স্থানীয় সমাজকে যুক্ত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক শিক্ষায় সহায়তা দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারী বিদ্যালয়গুলোর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত পরিসরে এই শিক্ষা ও চর্চার উন্নয়নে কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে।










