
কুমিল্লা অঞ্চলে নারী জাগরণের অগ্রদূত, বিশ্বের একমাত্র মুসলিম নারী নবাব এবং নারী শিক্ষার পথিকৃৎ নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণীর জীবনী পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ উপজেলা, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ও কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকা) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী।
রাইজিং কুমিল্লার পাঠকদের জন্য মনিরুল হক চৌধুরীর চিঠিটি তুলে ধরা হল:
সংসদ সদস্যের স্বাক্ষরিত চিঠিতে নবাব ফয়জুন্নেসার শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজসেবা ও নারী উন্নয়নে অসামান্য অবদানের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। মনিরুল হক চৌধুরী উল্লেখ করেন, বিশ্বের একমাত্র মুসলিম মহিলা নবাব, নারী শিক্ষার অগ্ৰদূত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজলার পশ্চিমগাঁয়ে আনুমানিক ১৮৩৪ সালে জনুগ্রহণ করেন।
ধর্মভিরু তবে প্রগতিশীল এই নারী ছোটবেলায় গৃহশিক্ষকের নিকট আরবি, ফারসি, বাংলা ও সংস্কৃত এই চারটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। গৃহ শিক্ষক মৌলভী তাজউন্দীন ফয়জুন্নেছাকে গড় তোলেন একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে। নবাব ফয়জুন্নেছার পিতা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী ও মাতা আরফান্নেছা চৌধুরানী যক্ষা আক্রান্ত পিতাকে মাত্র ১০ বছর বয়সে হারিয়ে তার পরিবার এক মহা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।
চিঠিতে বলা হয়, ১৮৬০ সালে ২৬ বছর বয়সে আত্মীয় জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১১ বছর তাদের দাম্পত্য জীবনের এক পর্যায়ে মান অভিমান ও শর্ত ভঙ্গের কারণে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং তিনি পৈত্ৰিক বাড়ি পশ্চিমগাঁওয়ে ফিরে আসেন। পিতার রেখে যাওয়া জমিদারির অংশ ও স্বামীর সম্পদের হিস্যা লাভের মাধ্যমে তিনি জমিদারির মালিক হন। পরবর্তীতে দক্ষ পরিচালনা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে ন্যায়পরায়ণ, শিক্ষানুরাগী ও পজাহিতৈশি জমিদার হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
মনিরুল হক চৌধুরী চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, কখনো পালকিতে, কখনো ঘোড়ায় চড়ে জমিদারি পরিদর্শনে বের হতেন। প্রজা সাধারণের দুঃখ কষ্ট নিজের চোখে দেখে লাঘবের চেষ্টা করতেন। নারী পুরুষ সবার জন্য তাঁর দানের হস্ত ছিল প্রসারিত। শুধুমাত্র অর্থকড়ির মধ্যেই তার দান সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মসজিদ, স্কুল, মক্তব, এতিমখানা, পুল- কালভার্ট ও শিল্প সাহিত্যের প্রসারসহ বিভিন জণকল্যানমূলক কর্মকাণ্ডে আবদান রেখেছেন।
তিনি যেমন ছিলেন ধর্মানুরাগী তেমনি ছিলেন সমাজসংস্কারক। তৎকালীন সমাজে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারকে উপেক্ষা করে তিনি সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন একজন নারী তার কর্মের মাধ্যমে কিভারে বিশ্বজয় করতে পারে। নবাব খেতাব প্রাপ্তির বিষয়টি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত।
চিঠিতে তার মানবিক কর্মকাণ্ডের নানা দিকও তুলে ধরা হয়। তংকালীন ব্রিপুরার (বর্তমান কুমিল্যা) জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ডগলাস একটি বিশেষ জনহিতকর কাজের জন্য অর্থ ঋণ চেয়ে বিভিন্ন জমিদারদের কাছে চিঠি পাঠান। কিন্তু এতে কেউ সাড়া না দিলেও ফয়জুন্নেছা ১লক্ষ টাকা দেন। পরবর্তীতে মি. ডপলাস এই ঋণের টাকা ফেরত দিতে গেলে জমিদার ফয়জুন্নেসা বলেন-” ‘ফয়জুন যা দেয়, তা দান হিসেবে দেয়, কৰ্জ হিসেবে নয়। ফয়জুন্নেসার এই উদারতার কথা বৃটেনের রাজপ্রাসাদেও আলোচিত হয়। মহারানী ভিক্টোরিয়া খুশি হয়ে এই মহি়সী নারীকে ১৮৮৯ সালে ‘ নবাব ‘ খেতাবে ভূষিত করেন|
এছাড়া ১৮৯৩ সালে হজ্ব পালন করতে গিয়ে মক্কায় মুসাফিরখানা, নহরে জোবাইদা খাল পুন:খনন এবং মাদ্রাসাই সাওলাতিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মক্কা ও মদিনায় প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থ সহযোগিতা পাঠাতেন। নিজ জমিদারির ১৪ টি মৌজায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীর পাশাপাশি তিনি নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানা যায়।
কুমিল্লায় নারীদের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফয়জুন জেনারেল হাসপাতাল’, যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেসা ফিমেল ওয়ার্ড নামে পরিচিত।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মৃত্যুর পূৰ্বে নবাব ফয়জুন্নেসা জনকল্যাণে নিজ বাড়ি সহ ২৯৭ একর সম্পত্তি ওয়াকফ-রাহে -লিল্লাহ করে যান। সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে যার অধিকাংশই এখন বেদখল হয়ে গেছে। ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ৬৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এমপি মনিরুল হক চৌধুরী জানান, ২০১৭ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর পশ্চিমগাঁয়ের বাড়ি সহ ৪.৫৪ একর জায়গা গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রত্নততু সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়| যাতে ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর থেকে জাতীয় জাদুঘরের ৯ম শাখা হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেসা জমিদার বাড়িতে জাদুঘরের কর্মকান্ড চলমান আছে।
২০০৪ সালে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নবাব ফয়জুন্নেছাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রৰদান করেন|
চিঠির শেষাংশে তিনি নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ, তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা এবং জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে তার জীবনী ও সাহিত্যকর্ম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উল্লেখ্য, “নবাব ফয়জুন্নেসা শুধু কুমিল্লার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের নারী শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের দাবি।”











