
ট্রেনে ভ্রমণের সময় রেললাইনের নিচে ও দুই পাশে ছোট ছোট পাথর বিছানো থাকতে দেখা যায়। দেখতে সাধারণ মনে হলেও রেলপথের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ট্রেনের বিপুল ভার সামলানো এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে এসব পাথর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু রেললাইনের নিচে এসব পাথর না থাকলে কী হতো?
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেললাইনের নিচে বিছানো পাথর রেলপথের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
রেললাইনের নিচের পাথরকে কী বলে?
রেললাইনের নিচে ও চারপাশে বিছানো পাথরকে বলা হয় ‘ট্র্যাক ব্যালাস্ট’। সাধারণত শক্ত পাথর ভেঙে তৈরি করা হয় এই ব্যালাস্ট। রেললাইনকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখতে ব্যবহৃত কাঠ বা কংক্রিটের আড়াআড়ি অংশকে বলা হয় স্লিপার।
ব্যালাস্ট স্লিপারগুলোকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রেললাইনের ওপর ট্রেনের চাকার মাধ্যমে সৃষ্ট বিপুল চাপ আশপাশের মাটিতে ছড়িয়ে দেয়। ভারতের রেলওয়ে গবেষণা, নকশা ও মান নির্ধারণকারী সংস্থা আরডিএসওর তথ্য অনুযায়ী, রেলপথের ভিত্তি সমতল রাখা এবং স্লিপারের অবস্থান ঠিক রাখতেও এসব পাথর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রেললাইনকে স্থিতিশীল রাখে যেভাবে
একটি চলন্ত ট্রেনের ওজনের কারণে রেললাইনের ওপর প্রচুর চাপ পড়ে। প্রতিনিয়ত এই চাপ পড়তে থাকলে রেললাইন সরে যাওয়া, নিচের মাটি দেবে যাওয়া কিংবা রেলপথের কাঠামোতে অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ট্র্যাক ব্যালাস্ট এই চাপ বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেয় এবং স্লিপারকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এ কারণে সাধারণ মসৃণ পাথরের পরিবর্তে ভাঙা ও ধারালো প্রান্তযুক্ত পাথর ব্যবহার করা হয়। এসব পাথর পরস্পরের সঙ্গে আটকে থেকে রেলপথের কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে।
বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনেও গুরুত্বপূর্ণ
রেললাইনের নিচে পানি জমে থাকলে মাটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে রেলপথের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ব্যালাস্টের পাথরগুলোর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা দিয়ে বৃষ্টির পানি সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে রেললাইনের নিচে পানি জমে থাকার আশঙ্কা কমে এবং ভিত্তির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
এ ছাড়া পাথরের স্তর মাটির বড় অংশ ঢেকে রাখায় আগাছার বৃদ্ধি কিছুটা কমে। তবে পাথরের ফাঁকে ময়লা ও জৈব পদার্থ জমলে সেখানে আগাছা জন্মাতে পারে।
রেললাইনের নিচে পাথর না থাকলে কী হতো?
প্রচলিত রেলপথে ব্যালাস্ট না থাকলে এবং এর বিকল্প কোনো উপযুক্ত কাঠামো ব্যবহার করা না হলে রেললাইন সরে যাওয়া, অসমভাবে বসে যাওয়া ও পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরির আশঙ্কা বাড়ত।
এতে রেলপথের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন বেড়ে যেতে পারত। পাশাপাশি রেললাইনের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যও বিঘ্নিত হতে পারত।
তবে সব রেলপথে পাথর ব্যবহার করা হয় না। আধুনিক কিছু রেলপথে ‘স্ল্যাব ট্র্যাক’ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এ ব্যবস্থায় আলগা পাথরের পরিবর্তে শক্ত কংক্রিটের কাঠামোর ওপর রেললাইন স্থাপন করা হয়। উপযুক্ত নকশা ও নির্মাণপদ্ধতির মাধ্যমে এ ধরনের রেলপথেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিরাপদ ট্রেন চলাচলে নীরব ভূমিকা
রেললাইনের নিচে ছড়িয়ে থাকা ছোট পাথরগুলো শুধু নির্মাণসামগ্রী নয়; বরং রেলপথের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রেনের ভার ছড়িয়ে দেওয়া, স্লিপারকে স্থির রাখা এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করার মাধ্যমে এসব পাথর প্রতিদিন নিরাপদ ট্রেন চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।










