
বাংলাদেশে বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এর কারণ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের দেওয়া একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষক স্বল্পতা এবং এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে দেরির কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
আর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বাড়ানোর লক্ষ্যে অভিজ্ঞ এবং শারীরিকভাবে সক্ষম শিক্ষকদের নিয়ে উপজেলাভিত্তিক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পুল গঠন করতে সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। খবর বিবিসি বাংলার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি, গভর্নিং বডি বা এডহক কমিটির অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজনের নিরীখে সাময়িকভাবে ওই পুল থেকে শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলের অত্যাবশ্যকীয় খাত থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সম্মানী দিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক সংকট ও এনটিআরসিএ’র শিক্ষক নিয়োগে দেরির কথা বললেও এই সংকট মানতে নারাজ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টা একটু বলি, এই নিয়োগ (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক) শিক্ষক সংকট বা নিয়োগে বিলম্বের কারণে না।
তিনি বলেছেন, যদি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমপিও পদ ফাঁকা না থাকে, কিন্তু সেখানে অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পুল থেকে নিয়োগ দেওয়া যাবে।
একইসাথে শিক্ষক নিয়োগ দিতে এনটিআরসিএ’র দেরি হয় না বলেও দাবি করেন আমিনুল ইসলাম।
অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক নেতারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘ভালো উদ্যোগ’ বলেই মন্তব্য করছেন।
তবে, এই উদ্যোগ কার্যকর কীভাবে করা যাবে এবং রাজনৈতিক নিয়োগ পরিহার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মানী দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট কতখানি?
গত আটই এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, সারাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্য রয়েছে ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষক পদ।
দেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪ হাজার ১২৯টি।
গত জানুয়ারিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে নিবন্ধিত প্রার্থীদের নিয়োগের সুপারিশ করে এনটিআরসিএ।
ওই সময় ১১ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী ৬৭ হাজার ২০৮টি শিক্ষক ও প্রভাষক পদের বিপরীতে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন।
এরপরেও বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য রয়ে গিয়েছিল।
শূন্য পদের এই পরিসংখ্যানই শিক্ষক সংকট তুলে ধরেছে।
ঢাকার একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারি শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংকট কাটানোর জন্য সাময়িকভাবে সরকারি এই উদ্যোগ ভালো হলেও কিছু আশঙ্কার দিকও রয়েছে।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর, এক বছরের শিক্ষাবর্ষ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পর্যায়ে যদি সাময়িকভাবে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে তিন মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় তখন যে বিষয় বা কোর্স পড়াবেন তা শেষ করা সময়সাপেক্ষ ও কঠিন বিষয়।
এই শিক্ষক মনে করেন, তিন মাস ক্লাস করালো পরে আরেকজন শিক্ষক ওই কোর্সের খাতা মূল্যায়ন করলে সেটি আশঙ্কা বা উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
শিক্ষক নেতা ও শিক্ষাবিদরা সরকারকে এই পুলের জন্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মো. মাজহারুল হান্নান বলেন, সংকটকালীন সময়ে সাময়িকভাবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া যেতেই পারে, আপাতদৃষ্টিতে ভালোই মনে হচ্ছে। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণের উদ্দেশ্য যদি থাকে তাহলে আমি বলবো সেটা ঠিক হবে না। মন্ত্রণালয়কে সতর্ক থাকতে হবে।
তবে, শিক্ষক সংকট সমাধানে এনটিআরসিএ’কে ‘রেগুলার টিচার অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেন এই শিক্ষক নেতা।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুইটি কমিটি গঠন করা হয়েছিলো।
ওই দুই কমিটিরই প্রধান ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ।
এই উদ্যোগ ভালো উল্লেখ করে মনজুর আহমদ জানান, তার কমিটিও এমন সুপারিশ করেছিলো।
তবে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করলে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে সম্মানী দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
শিক্ষাবিদ মনজুর আহমদ বলেন, সেই সক্ষমতা কতখানি আছে স্কুলগুলোর? হয়তো কিছু স্কুল পারবে, কিন্তু যেখানে বেশি দরকার সেখানে পারবে কিনা? উদ্যোগটা ভালো তবে কার্যকর কীভাবে সঠিকভাবে করা যাবে সেটাও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
‘অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএ নিয়োগের বিকল্প’
এই মুহূর্তে দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত পদ শূন্য রয়েছে জানতে চাইলে এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এরই মধ্যে শূন্য পদের চাহিদা চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী ১৫ই এপ্রিলের পরে বলতে পারবো, সারাদেশে কোন বিষয়ে কত শূন্য পদ আছে।
শিক্ষক নিয়োগ করতে কেন দেরি হয় এমন প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে দেরি হয় না।
তিনি জানান, আগে লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখতে সময় লাগতো তাই দেরি হতো। কিন্তু এখন এমসিকিউ পরীক্ষা হবে, দুইদিনের মধ্যে খাতা দেখা হয়ে যাবে, সুতরাং দেরি হওয়ার সুযোগ নেই।
এ মাসেই প্রতিষ্ঠান প্রধান বা সহকারী প্রধান পদে আরেকটি নিয়োগ পরীক্ষার সার্কুলার দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এখন থেকে প্রতিষ্ঠান প্রধান বা সহকারী প্রধান এবং সহকারী শিক্ষক বা লেকচারার পদে বছরে দুইবার নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন আমিনুল ইসলাম।
তবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের দেওয়া নিয়োগের বিকল্প নয় বলে জানান তিনি।
অভিজ্ঞ ও শারীরিকভাবে সক্ষম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্যই সরকার এই নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এনটিআরসিএ এন্ট্রি লেভেলে মেধা, যোগ্যতার ভিত্তিতে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে, এর কোনো বিকল্প নাই। কিন্তু পুল হচ্ছে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে যেখানে অতিরিক্ত ও পার্ট টাইম শিক্ষক দরকার, সেখানে এই পুলের শিক্ষক প্রয়োজন হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা








