
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও সুরস্রষ্টা শচীন দেব বর্মনের স্মৃতিকে ধারণ করে কুমিল্লায় আজ শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘শচীন মেলা-২০২৬’। ‘মর্ত্যের রাজ্য ছেড়ে, সুরের সাম্রাজ্যে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ৩০ ও ৩১ অক্টোবর নগরীর চর্থায় শচীন দেব বর্মনের পৈতৃক বাড়ির প্রাঙ্গণে এ মেলার আয়োজন করেছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন।
শিল্পীর জন্ম ও প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ মেলায় থাকছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় নগরীর ইউসুফ হাই স্কুল থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে।
মেলার আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু, পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এবং কুমিল্লা ওয়াসার চেয়ারম্যান মো. আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার।
প্রথম দিনের আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে অংশ নেবেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি এম মনিরুজ্জামান, লেখক ও গবেষক অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক এবং জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ আহমেদ কিসলু।
আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শচীন দেব বর্মনের সংগীতজীবন, সৃষ্টিকর্ম ও সাংস্কৃতিক অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতেই এ মেলার আয়োজন।
তবে প্রতিবছর জন্ম ও প্রয়াণ দিবস ঘিরে আনুষ্ঠানিক আয়োজন হলেও বছরের বাকি সময় অরক্ষিত পড়ে থাকে শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক বাড়িটি। সংস্কৃতিপ্রেমীদের দাবি, বাড়িটিকে শুধু স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ না করে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়া হোক।
জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শচীন দেব বর্মনের কুমিল্লার বাড়িতে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন করে পাকিস্তান সরকার। পরে সামাজিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র উদ্যোগে বাড়িটি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। ২০১৩ সালে বাড়িটির একাংশ আংশিকভাবে বেদখলমুক্ত করা হয়। পরের বছর, ২০১৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসন বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
কুমিল্লার ইতিহাস-গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, ‘আমাদের অহংকারের ধন, সুরের রাজকুমার শচীন দেব বর্মনকে আমরা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। শচীনকর্তার জন্ম ও মৃত্যুতারিখ এলেই আমাদের ঘুম ভাঙে। তাঁর স্মৃতি ও সংগীত ধরে রাখা এবং তাঁর কর্ম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় কিংবা সাংগঠনিক তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। কুমিল্লার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে শচীনকর্তার বাড়িতে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি জানাই।’
তিনি আরও বলেন, শচীনকর্তার বাড়িতে নিয়মিত গানের জলসা বসত। সেখানে উপমহাদেশের অনেক খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ অংশ নিতেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও একাধিকবার এসব জলসায় অংশ নিয়েছেন। নজরুলের বেশ কয়েকটি গানেও সুর দিয়েছেন শচীন দেব বর্মন।
১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের চর্থায় পৈতৃক বাড়িতে ত্রিপুরার রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেব বর্মন। তাঁর বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেব ছিলেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার রাজপরিবারের সন্তান ও সংগীতশিল্পী। পারিবারিক ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি সপরিবারে কুমিল্লায় চলে আসেন। চর্থায় তাঁদের বাড়ির জন্য জমি দিয়েছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা।
শৈশব থেকেই সংগীতপ্রতিভার বিকাশ ঘটে শচীন দেব বর্মনের। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি কুমিল্লায় ছিলেন। ১৯ বছর বয়সে কলকাতায় পাড়ি জমান এবং ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। পরে সপরিবারে মুম্বাই চলে যান। সেখানে চলচ্চিত্রজগতে সংগীত পরিচালক হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে।
১৯৬৯ সালে ‘আরাধনা’ হিন্দি চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী মীরা দেবীও ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম সুগায়িকা ও দক্ষ গীতিকার। তাঁর লেখা বহু গান গেয়েছেন শচীন দেব বর্মন।
১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী। সেখানেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
এদিকে, গত ১০ জুলাই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী শচীন দেব বর্মনের পৈতৃক বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় বাড়িটি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।









