
সমবয়সীরা যখন মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত সময় পার করছে, তখন সেই সময়কে ভিন্নভাবে কাজে লাগিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার লাকসামের মাদ্রাসাছাত্রী সুরাইয়া জান্নাত। মাত্র আট মাসে নিজের হাতে সম্পূর্ণ পবিত্র কুরআন মাজিদ লিখে শেষ করেছেন তিনি।
৩০ পারার এই কুরআনে রয়েছে ১১৪টি সূরা। ১ হাজার ১২৯ পৃষ্ঠার পুরো কুরআনটি লিখতে সুরাইয়ার ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৫৫টি কলম। তার হাতের লেখা এতটাই নিখুঁত ও পরিপাটি যে অনেকটা ছাপা অক্ষরের মতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সুরাইয়া জান্নাত লাকসাম উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের চাঁদগাঁও গ্রামের সৌদি প্রবাসী নুর হোসেন লিটন ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির মেয়ে। তিনি মুদাফরগঞ্জ এ.ইউ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি কুরআন হাতে লেখার কাজ শুরু করেন সুরাইয়া। মাদ্রাসার নিয়মিত ক্লাস ও পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে ধৈর্য ধরে লিখে আগস্ট মাসের শেষ দিকে সম্পূর্ণ কুরআনের অনুলিপি শেষ করেন তিনি।
কুরআন লেখার পুরো সময়জুড়েই পবিত্রতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন সুরাইয়া। প্রতিদিন লেখার আগে অজু করে নিতেন। এরপর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করে কুরআন লেখা শুরু করতেন।
নিজ হাতে পবিত্র কুরআন লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুরাইয়া জানান, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত লাভের পবিত্র উদ্দেশ্যেই তিনি এই কষ্টসাধ্য কাজটি করেছেন।
তবে কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ আট মাস নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন ধৈর্য ধরে কুরআনের আয়াত লিখে যেতে হয়েছে তাকে। পরিবারের সদস্যদের উৎসাহ ও সহযোগিতা তাকে কাজটি শেষ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
বিশেষ করে তার ছোট ভাই নাহিদ হাসান তাকে সার্বক্ষণিক উৎসাহ দিয়েছেন। নাহিদ হাসান আবেদনগর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সুরাইয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকে ঘিরে। ভবিষ্যতে বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ ‘সহিহ বুখারি’ নিজের হাতে লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
মেয়ের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগে আনন্দিত তার পরিবার। মা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ছোটবেলা থেকেই তার মেয়ের আরবি ভাষা ও লেখালেখির প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে কুরআন হাতে লেখার মতো কঠিন কাজের প্রতি মনোযোগী হন সুরাইয়া।
মেয়ের এই মহৎ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সৌদি প্রবাসী বাবা নুর হোসেন লিটন তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন।
সুরাইয়ার অনন্য উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা বলেন, বয়সের এই সময়ে নিজের হাতে সম্পূর্ণ কুরআন লিখে শেষ করা নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি দৃষ্টান্ত। তার হাতের লেখাও ছাপা অক্ষরের মতো নিখুঁত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের উপস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুরাইয়া জান্নাতকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
মাত্র আট মাসের অধ্যবসায়, ধৈর্য ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ কুরআন হাতে লিখে সুরাইয়া জান্নাত শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, স্থানীয়ভাবেও অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।










