শনিবার ২২ আগস্ট, ২০২৬

ইলিশে সরগরম লক্ষ্মীপুরের মাছঘাট, বাজারদর কমার অপেক্ষায় ক্রেতারা

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - Hilsa
ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে ইলিশের উপস্থিতি। জেলেদের জালে একসঙ্গে ধরা পড়ছে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের রুপালি ইলিশ। এতে দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা জেলেদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে মাছঘাট, আড়ত ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের।

জেলেদের ভাষ্য, রামগতি থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত মেঘনা নদীর বিভিন্ন অংশে এখন আগের তুলনায় বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে শুক্রবার রাত থেকে অনেক জেলের জালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ায় ঘাটগুলোতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য।

শনিবার দুপুরে মতিরহাট, করাতিরহাট, মজুচৌধুরীরহাট, রায়পুরের হাজীমারা ও পুরান বেড়ি মাছঘাট এবং হাইমচরের চরভৈরবী মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, ইলিশ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। ঘাটে চলছে মাছ বাছাই, সংরক্ষণ, কেনাবেচা এবং বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর প্রস্তুতি।

জেলে মালেক মাঝি, শরিফ, মাইনউদ্দিন, কালাম ও ছিডু মাঝিসহ কয়েকজন জানান, কয়েক দিন আগেও নদীতে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে শুক্রবার রাত থেকে হঠাৎ জালে ইলিশের পরিমাণ বেড়েছে। এতে দীর্ঘদিনের হতাশা অনেকটাই কেটেছে তাদের।

জেলেরা বলছেন, নদীতে ইলিশের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ধারদেনাও পরিশোধ করা সম্ভব হবে। আগামী দিনগুলোতে ইলিশের বিচরণ আরও বাড়বে বলেও প্রত্যাশা করছেন তারা।

চরভৈরবী মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জানান, দীর্ঘ সময় ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় স্থানীয় আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা চাপে ছিলেন। ঢাকার বিভিন্ন মোকামের সঙ্গে সরবরাহের চুক্তির বিপরীতে অনেক আড়তদার আগেই বড় অঙ্কের টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় সেই অর্থের বিপরীতে ইলিশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে নদীতে মাছ বাড়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে।

ইলিশের সরবরাহ বাড়ার প্রভাব পড়েছে বাজারদরেও। মতিরহাট মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির নেতা আমির হাওলাদার জানান, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, ৮০০ গ্রামের ইলিশ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

মৎস্য ব্যবসায়ীদের মতে, আশপাশের জেলার মাছঘাটগুলোতেও ইলিশের দামে একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নদীতে মাছের সরবরাহ বর্তমান গতিতে অব্যাহত থাকলে আগামী দুই থেকে চার দিনের মধ্যে দাম আরও কমে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসতে পারে।

তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও বাজারে এর দাম এখনো অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। রায়পুরের কয়েকজন ক্রেতা জানান, আগে এ সময়ে তুলনামূলক কম দামে মাঝারি আকারের ইলিশ কেনা গেলেও এবার একই আকারের মাছ কিনতে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।

রায়পুর বাজারের ক্রেতা আবদুল কাদের বলেন, “ইলিশ এখন বাজারে আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু দাম সেভাবে কমেনি। গত বছর যে আকারের ইলিশ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে কিনেছি, এবার সেটির দাম অনেক বেশি।”

আরেক ক্রেতা মো. সোহেল বলেন, “জেলেদের জালে ইলিশ বাড়ছে শুনে ভেবেছিলাম বাজারে দাম কমবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি ৭০০-৮০০ গ্রামের ইলিশও সাধারণ মানুষের জন্য বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কমবে—এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।”

ক্রেতাদের দাবি, ইলিশের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়াতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এবং ঘাট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের ব্যবধান কমানো গেলে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম দামে ইলিশ কেনার সুযোগ পাবেন।

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার নদীগুলো থেকে ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জন সন্তোষজনক হওয়ায় এবারও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

রায়পুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুল হাসনাইন বলেন, জনবল সংকটের কারণে আগের সময়ে নদীতে পর্যাপ্ত নজরদারি করা সম্ভব হয়নি। এতে জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। কার্যকরভাবে জাটকা সংরক্ষণ করা গেলে বর্তমানে নদীতে ইলিশের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারত এবং বাজারদরও তুলনামূলক কম থাকত।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে ইলিশের মৌসুম চলছে। নদী ও সাগরে যেভাবে ইলিশ ধরা পড়ছে, এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন