রবিবার ১ নভেম্বর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ

বাসস

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ/ছবি : সংগৃহীত

রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কিছু শোধনাগার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। 

মূল লক্ষ্য, একই পরিমাণ অপরিশোধিত তেল থেকে আরও বেশি পরিমাণ জ্বালানি উৎপাদন করা।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তেল কোম্পানি এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড্যারেন উডস জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তাদের শোধনাগারগুলোতে জ্বালানি উৎপাদনে রেকর্ড সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলের শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেলের ১০০ শতাংশ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে রয়েছে। অন্যদিকে ডিজেলের দামও প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের কাছাকাছি, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ দামের পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে।

এক বিবৃতিতে উডস বলেন, ‘তৃতীয় প্রান্তিকে আমরা বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’

উডসের ধারণা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থার কাছাকাছি ফিরতে আগামী বছরের অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক শীর্ষ তেল কোম্পানি শেভরন জানিয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইক ওয়ার্থ বলেন, ‘সরবরাহ সংকটে থাকা বাজারে আরও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা নতুন করে বিনিয়োগ করছি।’

তবে কোম্পানিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক নেলসন জানান, বিশ্বজুড়ে মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ এখনো বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, শোধনাগারগুলো পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে এবং রপ্তানি বাড়লে একসময় জ্বালানি পরিশোধনের মুনাফার হার কমে আসবে। তবে এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।

গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক্সনমোবিল ও শেভরন—উভয় কোম্পানির মুনাফাই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি পরিশোধনের মুনাফার হার বেড়ে যাওয়ায় তেল কোম্পানিগুলো বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।

তবে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শোধনাগারগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে ইরানের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে ইরানের বাধার কারণে বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে গেছে।

এ ছাড়া ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার শোধনাগারগুলোর।

জ্বালানি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জি গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, উৎপাদন পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালে রাশিয়াকে পেট্রোল ও ডিজেল আমদানি করতে হতে পারে। অর্থাৎ দেশটি জ্বালানি রপ্তানিকারক থেকে আমদানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

শুক্রবার রাশিয়ার জ্বালানিবিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সাংবাদিককে জানান, ইউক্রেন আবারও রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা শুরু করেছে। সর্বশেষ হামলায় দেশটির তিনটি তেল শোধনাগার এবং একটি গ্যাস-রাসায়নিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এক্সনমোবিলের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৫৪০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ৭৫০ কোটি ডলার।

অন্যদিকে, শেভরনের মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৯৯০ কোটি ডলার। গত বছরের একই প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা ছিল ৩৫০ কোটি ডলার।

তবে পেট্রোল ও ডিজেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। ভোক্তাদের ওপর জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে দেশটির প্রশাসন তেল কোম্পানিগুলোকে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে চাপ দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালেরো এনার্জি শুক্রবার জানিয়েছে, তারা লায়নডেলবাসেলের কাছ থেকে হিউস্টনের একটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা তেল শোধনাগার ৩২ কোটি ৫ লাখ ডলারে কিনতে চুক্তি করেছে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ শোধনাগারটির প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন