মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট, ২০২৬

মূল্যস্ফীতির প্রভাবে হাঁস-ফাঁস শিক্ষাজীবন, খাবারে পুষ্টির ঘাটতি

মোহাম্মদ রাজীব, কুবি প্রতিনিধি

Rising Cumilla - comilla unniversity students
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী/ছবি: রাইজিং কুমিল্লা সম্পাদিত

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনে নেমে এসেছে চরম আর্থিক সংকট। এই চিত্র পুরো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের।

টিউশনির সীমিত আয়ে এখন আর তাদের মাস পার হচ্ছে না; উল্টো মেস ভাড়া, খাবার ও পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের মৌলিক চাহিদার সাথে আপোস করতে হচ্ছে।

দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া ক্যাম্পাস জীবনের এমন নানামুখী টানাপোড়ন ও শিক্ষার্থীদের নীরব দীর্ঘশ্বাসের কথাগুলো তুলে ধরেছেন মোহাম্মদ রাজীব।

​’মেস ও হলের ডাইনিংয়ে পুষ্টির আকাল’

​দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মেস ও হলের ডাইনিংয়ে এখন পুষ্টির চরম আকাল। বর্ষা হোক বা শীত, বাজারে সবজির দামে ওঠানামা থাকলেও হলের পাতে চলে কেবল আলুর একক আধিপত্য। সীমিত বাজেটে মাছ, মুরগি বা ডিমের সামান্য ঝোলের সঙ্গে আলু মিশিয়ে ডাইনিং ম্যানেজাররা খরচ সামলানোর চেষ্টা করেন, যেখানে পুষ্টি ও স্বাদ পুরোপুরি উপেক্ষিত। ​বাবুর্চিরাও সীমিত বাজেটের কারণে নিরুপায়।

ফলে মাসের পর মাস শিক্ষার্থীদের পাতে জুটছে একই স্বাদের আলু-মুরগির ঝোল আর পাতলা ডাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা খরচ মিটিয়ে টাকা বাঁচানোর শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে এই খাবারের টেবিল। দিনের পর দিন এমন একঘেয়ে ও পুষ্টিহীন খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা আজ হুমকির মুখে। বাজারের ঊর্ধ্বমুখী দামের ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই।

তাই এই সংকট উত্তরণে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ। ডাইনিংয়ে সামান্য প্রশাসনিক ভর্তুকি যুক্ত হলে খাবারে যেমন পুষ্টি নিশ্চিত হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মলিন মুখেও ফুটবে কিছুটা স্বস্তির হাসি।

মো. সাইদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

​’শিক্ষাসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও পড়াশোনার বাড়তি খরচ’

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষাসামগ্রীর দাম, যা শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। খাতা, কলম থেকে শুরু করে বইপত্র ও ফটোকপির খরচ গত কয়েক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষ করে যাদের নিয়মিত ল্যাব বা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস থাকে, তাদের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি ও প্রিন্টিংয়ের পেছনেই মাসের বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল পড়াশোনার বাড়তি খরচ।

প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য নিয়মিত ইন্টারনেট ডেটা কিনতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। টিউশনির সামান্য আয়ে যেখানে মেস ভাড়া আর তিনবেলার খাবার জোটানোই দায়, সেখানে পড়াশোনার এই বাড়তি খরচ বহন করা অনেকের জন্যই অসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​খরচ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী এখন পুরনো বইয়ের দোকানে ছুটছেন, চোখের ক্ষতি করে পিডিএফ পড়ছেন কিংবা একই খাতা একাধিক বিষয়ে ব্যবহার করছেন। দ্রব্যমূল্যের এই যাঁতাকলে শিক্ষাগ্রহণের মৌলিক অধিকারটুকুও আজ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

আল মাসুম হোসেন, শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘টিউশনির আয়ে টান ও বেঁচে থাকার লড়াই’

​বাবা ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিথিলার জীবন এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। মায়ের শেষ সম্বল হাতের চুড়ি বিক্রির টাকায় ভর্তি হয়ে, পরিবারের খরচ জোগাতে তাকে শহরে তিনটি টিউশনি করতে হয়। কিন্তু বর্তমানের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে টিউশনির সীমিত আয়ে তার টিকে থাকা দায়।

যাতায়াত ভাড়া আর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় দুপুরে কেবল বন রুটি খেয়ে তাকে দিন পার করতে হয়। প্রচণ্ড অ্যাকাডেমিক চাপ, সারা দিনের ক্লান্তি আর আধপেটা খেয়ে থাকার পরও তার লড়াই থামে না। মেসে ফিরে রুমমেট অন্তরার ভাগ করে দেওয়া খাবারে রাতের আহার জোটে। ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় অসুস্থ মায়ের জন্য টাকা পাঠাতে না পারার চিন্তায় যখন তার চোখে জল, ঠিক তখনই মেসেজ আসে—গত সেমিস্টারে প্রথম হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় তাকে বৃত্তি দিচ্ছে।

এভাবেই মায়ের দোয়া, বন্ধুত্বের সহযোগিতা আর অদম্য পরিশ্রমে জয়ী হয় দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট এক শিক্ষার্থীর বেঁচে থাকার লড়াই।

মীর সুমাইয়া ইয়াসমিন, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ‘লুকানো দীর্ঘশ্বাস’

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের চোখে থাকে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বমুখী বাজারে সেই স্বপ্নের পথটা ভীষণ অমসৃণ। ক্লাস, পরীক্ষা আর ক্যারিয়ারের চিন্তার পাশাপাশি তাকে প্রতিনিয়ত হিসাব কষতে হয় পরিবারের সামর্থ্যের। বন্ধুরা যখন রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেয় বা ঘুরতে যায়, সে নীরবে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

কারণ, সামান্য কিছু টাকা খরচ করার আগে তার মনে পড়ে যায়—সবকিছুর বাড়তি দামের ভিড়ে এটি বাবার হাড়ভাঙা খাটুনির উপার্জন। মায়ের ফোনে হাসিমুখে “ভালো আছি” বললেও, মাসের শেষে পকেট শূন্য হওয়ার কষ্টটা সে লুকিয়ে রাখে। সে জানে, তার আর্থিক টানাপোড়েনের কথা শুনলে পরিবার আরও দুশ্চিন্তায় পড়বে।

বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে নিজের জরুরি প্রয়োজনটুকুও বিসর্জন দিতে হয় তাদের। বাজারের আগুনে পুড়তে থাকা এই শিক্ষার্থীদের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অপূর্ণ ইচ্ছা আর নীরব দীর্ঘশ্বাস। আর এই দীর্ঘশ্বাসই একদিন তাদের সফল হওয়ার সবচেয়ে বড় জেদ হয়ে ওঠে।

মোঃ শহিদুল ইসলাম মনির, শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

​’ছাত্রীদের আবাসন সংকট ও ব্যক্তিগত খরচের হিসাব’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একজন নারী শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবাসন সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। পর্যাপ্ত হলের আসন না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেককে বাইরে মেস বা সাবলেটে থাকতে হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে নিরাপদ পরিবেশের মেস ভাড়া আকাশছোঁয়া।

এর পাশাপাশি খাবার, যাতায়াত, শিক্ষা উপকরণ এবং মেয়েদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় মাসিক খরচ ৮-১০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য মারাত্মক চাপের।

ফলে পরিবারের ওপর খরচের বোঝা কমাতে অনেক ছাত্রীই নিজের জরুরি প্রয়োজনগুলো মুখ বুজে বিসর্জন দিচ্ছেন। আবাসন সংকট ও খরচের এই তীব্র চাপ কেবল থাকার সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তির সাথে সরাসরি জড়িত। দ্রব্যমূল্যের এই কশাঘাতে নারী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের পথ মসৃণ করতে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রিমি আক্তার, শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগ ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে বাধা’

​দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবাটা এখন যেন বিলাসিতা। মেস ভাড়া, খাওয়া আর খাতার খরচ মেটাতেই মাস শেষে টিউশনির টাকা ফুরিয়ে যায়। যেখানে দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটাতেই এত হিসাব-নিকাশ, সেখানে স্কিল ডেভেলপমেন্টের সুযোগ খোঁজা অমাবস্যায় পূর্ণিমা খোঁজার শামিল।

প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজারে টিকে থাকতে আইটি বা ভাষা শিক্ষার মতো কোর্সগুলো জরুরি। কিন্তু মোটা অঙ্কের ফি, ল্যাপটপ বা দ্রুতগতির ইন্টারনেটের অভাবে তা মধ্যবিত্তের জন্য আকাশকুসুম কল্পনাই থেকে যায়। বাধ্য হয়ে অনেকে অল্প টাকায় নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে প্রতারিত ও হতাশ হচ্ছে।

তাছাড়া, দিনশেষে ২-৩টি টিউশনির ধকল সামলে নতুন দক্ষতা অর্জনের মতো সময় ও মানসিক শক্তিও অবশিষ্ট থাকে না।

এককথায়, যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে আর্থিক টানাপোড়েন ও স্কিল ডেভেলপমেন্টের এই অসম দৌড়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আজ এক গভীর অনিশ্চয়তায়।

​উম্মে হাবিবা, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন