শুক্রবার ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরীক্ষামূলক ব্ল‍্যাক রাইস চাষে নতুন সম্ভাবনা

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - black rice cultivation
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের বীরচন্দ্রপুর এলাকায় দিগন্তজুড়ে সবুজ ধানক্ষেতের মধ্যে নজর কাড়ছে কালচে রঙের ধানের শীষ। বাতাসে দুলতে থাকা ব্যতিক্রমী এই ধান দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে আসছেন উৎসুক মানুষ ও কৃষকেরা। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধানের পরীক্ষামূলক চাষ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় কৃষক মো. সায়মন মোল্লা।

উপজেলার আবদুল্লাহপুর এলাকার বাসিন্দা সায়মন মোল্লা চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে পুরো জমিতে ধানের শীষ এসেছে। এখন পর্যন্ত ফসলের অবস্থা ভালো রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত আশানুরূপ ফলন ও ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী বছর আরও বড় পরিসরে এই ধানের আবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

প্রচলিত ধান চাষের বাইরে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। অনেকেই তাঁর জমিতে এসে কালো ধানের শীষ দেখছেন এবং এ জাতের ধান চাষের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। পরীক্ষামূলক এই চাষ সফল হলে স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইনভিত্তিক তথ্যের প্রসারের ফলে কৃষকেরা এখন ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম থেকে নতুন জাতের ফসল চাষ সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন। সায়মন মোল্লার ব্ল্যাক রাইস চাষের উদ্যোগও তেমনই একটি উদাহরণ।

কৃষক সায়মন মোল্লা বলেন, ছোটবেলা থেকেই ধান চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পদ্ধতিতে ধান চাষ করছেন তিনি। তবে মোবাইল ফোনে ইউটিউবের মাধ্যমে ব্ল্যাক রাইস চাষ সম্পর্কে জানতে পেরে নতুন জাতটি চাষের আগ্রহ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, “এ মৌসুমে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ব্ল্যাক রাইসের বীজ সংগ্রহ করি। প্রতি কেজি বীজ ৫০০ টাকা দরে কিনেছি। এরপর বীজতলা তৈরি, জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণ করি। নিয়মিত পরিচর্যার ফলে জমিতে ধানের শীষ এসেছে। কোনো কোনো শীষ বেশ বড় ও পরিপুষ্ট হয়ে উঠছে। আশা করছি, ফলন ভালো হবে।”

সায়মন আরও বলেন, ব্ল্যাক রাইসের বীজের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে। পুষ্টিগুণের কারণে কালো চালেরও আলাদা চাহিদা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। পরীক্ষামূলক চাষে আশানুরূপ ফলন পাওয়া গেলে আগামী বছর আরও বড় পরিসরে এই ধান চাষ করবেন তিনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতি বিঘা জমিতে ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান উৎপাদনের আশা করছেন এই কৃষক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্ল্যাক রাইস একধরনের বিশেষ জাতের ধান, যার চালের বাইরের স্তর গাঢ় বেগুনি থেকে কালো রঙের হয়ে থাকে। এতে অ্যান্থোসায়ানিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদান রয়েছে। এ ছাড়া এতে খাদ্য-আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে সাধারণ চালের তুলনায় কালো চালের পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য আলাদা।

এই চাল দিয়ে ভাত, পায়েস, খিচুড়ি, পিঠাসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা যায়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যেও কালো চালের প্রতি আগ্রহ রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক মো. বাছির মিয়া বলেন, প্রচলিত ধানের বাইরে এ ধরনের ব্যতিক্রমী ধান চাষ এলাকায় তেমন দেখা যায় না। এবারই প্রথম তিনি এ ধানের চাষ দেখেছেন। বিষয়টি তাঁর মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। সুযোগ পেলে তিনিও এ জাতের ধান চাষ করতে চান।

আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, ব্ল্যাক রাইস পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি বিশেষ জাতের ধান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত এই জাতের ধান আখাউড়ায় মৌসুমি ধান চাষের পাশাপাশি সীমিত জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ধানের ফলন বাড়াতে কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। এ জাতের ধান সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকেরা লাভবান হতে পারেন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্ল্যাক রাইসের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হবে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন জাতের ধান চাষ সম্প্রসারণের আগে স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা, মানসম্মত বীজ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের চাহিদা যাচাই করা জরুরি। পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্য পাওয়া গেলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় এ জাতের ধানের আবাদ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন