
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। উপকারভোগীদের সেবা আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ডিজিটাল টিসিবি কার্ড, ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট, অল-ইন-ওয়ান পিওএস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)ভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) টিসিবির সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির কার্যক্রমের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। বিষয়টি জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামাল হোসেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। সভাপতিত্ব করেন টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ।
মোবাইল অ্যাপেই মিলবে টিসিবির সেবা
নতুন ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টিসিবির উপকারভোগীরা প্রচলিত কার্ডের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটালি স্বাক্ষরিত ও এনক্রিপ্টেড কিউআর কোড ব্যবহার করে উপকারভোগীর পরিচয় এবং পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হবে।
ফলে কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলেও প্রকৃত উপকারভোগী নির্ধারিত পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
অনলাইনেই ডিলার নিয়োগ
ডিলার ব্যবস্থাপনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে। অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচন করা যাবে। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট কালেকশন চালু হলে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতাও বাড়বে।
এআই দিয়ে হবে রিয়েল-টাইম নজরদারি
অল-ইন-ওয়ান পিওএস ব্যবস্থায় পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদের ব্যবস্থা থাকবে।
এর পাশাপাশি এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন এলাকায় কত পণ্য বিক্রি ও বিতরণ হচ্ছে এবং কোথাও অনিয়মের কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
এতে অনিয়ম শনাক্ত করার পাশাপাশি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে আশা করছে টিসিবি। উপকারভোগীদের দ্রুত তথ্য ও সহায়তা দিতে এআইভিত্তিক যোগাযোগকেন্দ্র চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
যাচাইয়ে বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে একটি যাচাই করা ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরি হয়েছে। সরকারি ভর্তুকির সুবিধা যাতে প্রকৃত ও যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে ক্ষেত্রে এই ডাটাবেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ উপকারভোগী টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
সাশ্রয় হতে পারে ৩৫০ কোটি টাকা
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় এখনও বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছানোর সময় দামের ব্যবধান এবং সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে টিসিবির সেবায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সরকারি ভর্তুকি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে টিসিবির বিভিন্ন উদ্যোগ ও ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে টিসিবির ডিজিটাল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।










