
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষায় জবাবদিহিমূলক সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও সরকারি প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তরুণদের নেতৃত্বে সকল শ্রেণিপেশাসহ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও আমাদের রাজনীতি, নির্বাচন ও সংসদ মূলত অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম, পুরুষতন্ত্র এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র—এই পাঁচটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় “জয়ী দল সবকিছু পাবে”—এমন একপাক্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা আবশ্যক।’
তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার থাকলেও নির্বাহী বিভাগকে অধিকতর ক্ষমতায়িত করে এমন কিছু অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করা হচ্ছে। অন্যদিকে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকরভাবে কাজের পরিবেশ দিতে হবে। পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন ও এসআরবি আইনগুলো ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত বিচারবিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে সব পক্ষের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সুশাসনের স্বপ্ন পূরণে দেশের রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত দীক্ষার ভিত্তিতে আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান সরকারের ক্ষমতার উৎস এ দেশের জনগণ। দীর্ঘ স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের রায় ও সমর্থনে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং রাষ্ট্রীয় মদদে গুম ও খুন বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
মাহদী আমিন আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং আপামর জনসাধারণের। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ। একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন দেশ গড়তে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং যুক্তিসংগত সমালোচনা ও পরামর্শ ইতিবাচকভাবে গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, এমপি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা ব্যক্তির দলীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হচ্ছে কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে সাংবিধানিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের চিন্তা ও মানসিকতারও পরিবর্তন জরুরি। দেশের স্বার্থ রক্ষায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী বলেন, বর্তমান সংসদের প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী হওয়ায় সংসদে জনগণের স্বার্থের চেয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিল বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা বলেন, নির্বাচন কেবল পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। জবাবদিহি নিশ্চিতকারী তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো কারও নিয়ন্ত্রণে থাকলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুসংগঠিতভাবে অপপ্রচার বা বট চালিয়ে রাজনৈতিক বুলিং ও ডিজিটাল সহিংসতা সৃষ্টি সংঘবদ্ধ অপরাধের রূপ নিতে পারে। এভাবে তরুণদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় উল্লেখ করে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন ও সরকারি চাকরির ভাইভা নম্বরের মতো প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।










