শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এক হাসিতেই বাবা-মা পূর্ণতার নাম আমার “মা”

সাদিকুর রহমান

Rising Cumilla - With just one smile, my parents named me Ma—the embodiment of fulfillment.
এক হাসিতেই বাবা-মা পূর্ণতার নাম আমার “মা”/প্রতীকি ছবি/লেখক

​জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় অনেকের কাছেই ‘বাবা’ এবং ‘মা’ শব্দ দুটি দুটি ভিন্ন সত্তা, দুটি আলাদা শক্তির উৎস এবং দুটি স্বতন্ত্র নির্ভরতার আকাশ। কিন্তু আমার পৃথিবীর ব্যাকরণটা একদমই আলাদা, কিছুটা ব্যতিক্রমী। যখন এই জগতটাকে চেনার মতো সামান্যতম বোধটুকুও আমার ভেতরে জন্ম নেয়নি, যখন জীবনের জটিল সমীকরণগুলো বোঝার ক্ষমতা ছিল না ঠিক তখনই আমার বাবা পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে, মহান স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে। সেই যে আমার ছোট্ট পৃথিবীতে এক বিশাল শূন্যতা আর হাহাকারের সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে কোনোদিন একা অনুভব করতে দেননি যে অসামান্য মানুষটা, তিনি আমার মা।

আজ জীবনের এতগুলো বসন্ত পার করে যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখি এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের আখ্যান, যেখানে আমার মা একাই পালন করে গেছেন একাধারে বাবা ও মায়ের ভূমিকা।

​আজ যখনই কেউ আমার সামনে ‘বাবা’ বলে ডাক দেয় বা বাবার স্মৃতি নিয়ে কোনো গল্প ফাঁদে, আমার মানসপটে অবধারিতভাবে ভেসে ওঠে কেবল একটিই মুখ। সেই মুখে যেমন আছে মা হওয়ার অসীম মমতা ও করুণা, ঠিক তেমনি আছে বাবা হওয়ার সেই বজ্রকঠিন দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধ। এই দুই সত্তা মিলেমিশে সেখানে একাকার হয়ে গেছে। আমার জীবনে বাবা এবং মা উভয় সংজ্ঞারই একমাত্র প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘মা’।

জগতের সমস্ত অভিধান খুঁজেও আমি এই শব্দের চেয়ে শক্তিশালী কোনো শব্দ খুঁজে পাই না, যা আমার জীবনের এই পূর্ণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। প্রতিটা সাফল্যের পাশে আনন্দ হয়ে,প্রত্যেকটা ব্যর্থতার রাতে নরম ঘুম হয়ে,ফুলের মতো ফুটে থাকে মায়ের নাম। আমার প্রতিটি ছোট-বড় অর্জনে, যখন চারপাশ প্রশংসার জোয়ারে ভেসে যায়, তখন আমি সবার আগে খুঁজে ফিরি সেই চিরচেনা চোখের চাউনি। মায়ের চোখের সেই এক চিলতে তৃপ্তির ঝিলিকই আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার। সেই হাসির কাছে দুনিয়ার সমস্ত মেডেল, সার্টিফিকেট আর সম্মাননা যেন ফিকে হয়ে যায়। সাফল্যের সেই শিখরে দাঁড়িয়ে আমি যখন মায়ের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি আমার এই উত্তরণের পেছনে তাঁর কত রাতের প্রার্থনা আর কত দিনের অশ্রু লুকিয়ে আছে।

​আবার মুদ্রার উল্টো পিঠে যখন জীবনের রুক্ষ পথে চলতে গিয়ে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বিষণ্ণ মনে, ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরি তখনও আমার একমাত্র আশ্রয় সেই মানুষটিই। যখন চারপাশটা অন্ধকার লাগে, যখন মনে হয় আর বুঝি উঠে দাঁড়ানো সম্ভব নয়, তখন মায়ের সেই পরম মমতাময় হাতের স্পর্শ কিংবা তাঁর শান্ত অভয়বাণীই হয়ে ওঠে আমার অশান্ত হৃদয়ের মলম। সেটিই হয়ে ওঠে শান্তির সেই ‘নরম ঘুম’, যা মুহূর্তের মধ্যে আমার সমস্ত অবসাদ ধুয়ে মুছে দেয়। তিনি সেই অসামান্য জাদুকর, যিনি জীবনের সব ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে এক হাতে সংসারের কঠোর হাল ধরেছেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো, আবার অন্য হাতে আমাকে আগলে রেখেছেন পৃথিবীর সমস্ত রূঢ়তা, তিক্ততা আর আঘাত থেকে। বাবার অনুপস্থিতি যেন কোনোদিন আমাকে কুঁকড়ে দিতে না পারে, সেজন্য তিনি নিজের চারপাশেই তৈরি করেছিলেন এক অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়।

​অবুঝ বয়সে বাবাকে হারানোর যে দগদগে ক্ষত আমার হৃদয়ে ছিল, তা মা পূরণ করেছেন নিজের তিল তিল আত্মত্যাগে। তিনি কেবল আমাকে জন্ম দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি; তিনি হয়ে উঠেছেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এবং একমাত্র নিরাপদ বন্দর। সমাজ যখন একা একজন মায়ের দিকে বাঁকা চোখে তাকাত, যখন অভাব আর দারিদ্র্য আমাদের দরজায় কড়া নাড়ত মা তখন হিমালয়ের মতো অটল থেকেছেন। সমাজের সেই চোখরাঙানি বা অভাবের চোখরাঙানি সবকিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তিনি আমাকে বড় করেছেন এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো, যার শীতল ছায়ায় আমি আজ বড় হয়েছি, স্বপ্ন দেখতে শিখেছি।

​মায়ের এই লড়াইটা সহজ ছিল না। যে বয়সে মানুষের নিজের জন্য অনেক সাজানো স্বপ্ন থাকে, অনেক রঙিন বাসনা থাকে, সেই বয়সেই তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত বসন্ত বিসর্জন দিয়েছেন কেবল আমার মুখে একটুখানি হাসি দেখার জন্য। নিজের শখের কথা তিনি ভুলে গিয়েছেন আমার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে গিয়ে। মাসের পর মাস তিনি হয়তো নিজের জন্য একটি নতুন পোশাক কেনেননি, কিন্তু আমার পড়াশোনা বা ছোটখাটো সব বায়না মেটাতে তিনি ছিলেন কার্পণ্যহীন। তাঁর এই নীরব সংগ্রাম কোনো ক্যামেরায় ধরা পড়েনি, কোনো সংবাদপত্রের পাতায় আসেনি কিন্তু আমার হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দনে সেই সংগ্রামের কথা লেখা আছে।

​প্রতি বছর যখন মা দিবস আসে, সেটি অনেকে অনেক ঘটা করে পালন করে। আসলে আমাদের মতো সন্তানদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিন নয় বরং আমাদের জন্য প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা আর প্রতিটি মুহূর্তই হচ্ছে মায়ের প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সময়। যে মানুষটি তাঁর অস্তিত্ব দিয়ে আমার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছেন, যাঁর হাত ধরে আমি প্রথম কথা বলতে শিখেছি, প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছি তাঁর জন্য এক জনম সেবা করেও এই ঋণের বোঝা কোনোদিন হালকা করা সম্ভব নয়। তাঁর ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য এই পৃথিবীর কোনো উপাদানের নেই।

​মায়ের ভালোবাসা অনেকটা বাতাসের মতো যা দেখা যায় না ঠিকই, কিন্তু যা ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। বাবার ছায়া না থাকা সত্ত্বেও আমি আজ সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি কেবল মায়ের সেই নীরব সাধনার ফলে। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে লড়াই করতে হয়। তিনি শিখিয়েছেন আত্মসম্মান বজায় রেখে কীভাবে পথ চলতে হয়। আমার চারিত্রিক গঠন থেকে শুরু করে আমার চিন্তাচেতনা সবখানেই মায়ের রুচি আর আদর্শের প্রতিফলন।​আজকের এই মা দিবসে আমার প্রার্থনা কেবল একটাই পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন।

আর আমার মা, যিনি আমার জন্য বাবা-মায়ের দ্বৈত রূপ হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি যেন দীর্ঘকাল আমার মাথার ওপর সেই বটবৃক্ষের শীতল ছায়া হয়ে থাকেন। আমি হয়তো বড় হয়েছি, অনেক কিছু শিখেছি, কিন্তু মায়ের কাছে আমি আজও সেই ছোট্ট অবুঝ সন্তানটিই রয়ে গেছি, যে কোনো বিপদে পড়লে সবার আগে ‘মা’ বলে চিৎকার করে ওঠে। আমার সফলতার প্রতিটি সিঁড়ি গড়া হয়েছে মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ত্যাগের বিনিময়ে। আমার পরাজয়ের বিষাদগুলো ধুয়ে গেছে মায়ের আঁচলে। তাই আজ এবং আগামীর প্রতিটি দিন হোক মায়ের জন্য। মা কেবল একটি শব্দ নয়, মা এক পরম নির্ভরতার নাম, মা এক চিরস্থায়ী শান্তির নাম। যে নামের পাশে পৃথিবীর আর কোনো প্রাপ্তির তুলনা হয় না।

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঠিকানা: সালমানপুর, কোটবাড়ি, কুমিল্লা।

আরও পড়ুন