
আজ ৩ জুন ‘বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস’ বা বিশ্ব মুগুর পা দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের রূপকার, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ড. ইগনাচিও পনসেটি-এর জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়।
ড. পনসেটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন, যা কোনো ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই জন্মগত মুগুর পা বা ক্লাবফুট সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে সক্ষম। বর্তমানে সারা বিশ্বে এই পদ্ধতিটি ‘পনসেটি মেথড’ বা পনসেটি পদ্ধতি নামে সমাদৃত। এই দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো ক্লাবফুট সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর জন্য সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
আমরা সবাই প্রত্যাশা করি একটি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর শারীরিক গঠন হবে স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে ভূমিষ্ঠ শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হবে, তার দুরন্তপনায় মুখরিত হবে চারপাশ। কিন্তু অনেক সময় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে তা আর হয়ে ওঠে না।
ভূমিষ্ঠ শিশুর জন্মগত ত্রুটি হিসেবে যে কয়টা সমস্যা দেখা যায়, ক্লাবফুট (মুগুর পা) সমস্যা তার মধ্যে অন্যতম। সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আমাদের দেশে প্রতি হাজারে একটি বা দুটি শিশু এই সমস্যা নিয়ে জন্মাতে পারে।
এই হিসাবে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজারেরও অধিক শিশু এ সমস্যা নিয়ে জন্মায়। শিশুর সাবলীলভাবে হাঁটতে না-পারার কষ্ট শুধু তাকেই কষ্ট দেয় না, স্বজনদেরও তা নীরব যন্ত্রণা দেয়। এই সমস্যায় আক্রান্ত পা ভেতরের দিকে বেঁকে যায় এবং শিশু স্বাভাবিকভাবে পায়ের পাতার ওপর দাঁড়াতে পারে না, যা সময়মতো চিকিৎসা না করালে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি বেঁকে যায় এবং সে আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।
শিশুর এ সমস্যা হওয়ার পেছনে সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, শিশুর শরীরের কোষের মৌলিক গঠনের কিছু পরিবর্তনের কারণে এমন হতে পারে। এর জন্য শিশুটির মা-বাবাকে দোষারোপ করার কোনো কারণ নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশে এই কার্যক্রম পরিচালনায় দেশব্যাপী অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ‘ইউনাইটেড পারপাস বাংলাদেশ’। তাদের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ‘মিরাকলফিট’। এই যৌথ উদ্যোগের ফলে এখন কেবল বড় শহর নয়, বরং দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকাতেও সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এই কার্যক্রমের মূল শক্তি হলো ‘আর্লি ডিটেকশন এন্ড রেফারেল’ বা জন্মের পরপরই দ্রুত শনাক্তকরণ এবং নিকটস্থ ক্লাবফুট ক্লিনিকে সেবার জন্য প্রেরণ করা। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় ক্লিনিক এবং হাসপাতালগুলো এখন নবজাতকের পায়ের শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে রেফার করছে।
দক্ষ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পনসেটি মেথডের প্রটোকল মেনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল প্লাস্টার বা বিশেষ ধরনের জুতা পরানোই শেষ কথা নয়; চিকিৎসার সুফল ধরে রাখতে পরিবারের সদস্যদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পের উদ্যোগে অভিভাবকদের নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হচ্ছে যাতে তারা ধৈর্য ধরে ব্রেস পরানোর নিয়ম মেনে চলেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ‘ওয়াক ফর লাইফ’ কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে ৩৮,০০০-এরও বেশি শিশু চিকিৎসা সেবা পেয়েছে এবং এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
তবে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই সাফল্য প্রায়শই আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার কাছে বাধাগ্রস্ত হয়। সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)-তে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাটি বিনামূল্যে পাওয়ার সুযোগ হলেও যাতায়াত খরচ, দীর্ঘ দূরত্ব এবং মায়েদের প্রতি পারিবারিক সমর্থনের অভাব চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটায়।
এই যোগাযোগ ও দূরত্বের বাধা দূর করে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসাকে আরও সহজলভ্য করতে কুমিল্লা জেলায় ইউনাইটেড পারপাস ক্লাবফুট বা জন্মগত পায়ের পাতা বাঁকা শিশুদের চিকিৎসা কার্যক্রমটি ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্পের অধীনে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কুমিল্লা’র কোতয়ালির হাউজিং এস্টেটে অবস্থিত অর্ক কেয়ার সেন্টার-এ কার্যক্রমটি পরিচালনা করছে। এর ফলে এই অঞ্চলের শিশুদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন অনেক সহজ হয়েছে।
ক্লাবফুট জয়ের মূল চাবিকাঠি হলো দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, সবচেয়ে ভালো হয় জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করতে পারলে। এটি নিশ্চিত করতে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বাস্থ্য সহকারী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) এবং পরিবার কল্যাণ সহকারী, অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
জন্মের পরপরই পায়ের পাতার সামান্য অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে তারা যদি শিশুদের দ্রুত সঠিক ক্লিনিকে পাঠান, তবে একটি শিশু ফিরে পেতে পারে তার স্বাভাবিক ও দুরন্ত শৈশব। আসুন, সচেতন হই এবং শিশুদের জন্য একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি।
লেখক: সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক।









