শুক্রবার ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মা-মেঘনায় চাঁদপুরের জেলেরা, ঘাটে উঠছে ইলিশ

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

RisingCumilla - Fishermen in Chandpur
ছবি: সংগৃহীত

নিরাপদে মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে পদ্মা-মেঘনা নদী। রুপালি ইলিশের আশায় নদীতে নেমেছেন হাজার হাজার জেলে। চাঁদপুরের ৭০ কিলোমিটার নৌ এলাকায় ইলিশ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। এরই মধ্যে নদী থেকে ইলিশ, পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে শুরু করেছেন জেলেরা। এতে সরগরম হয়ে উঠেছে নদী উপকূলীয় মাছের আড়তগুলো।

তিন সপ্তাহের বিরতির পর মাছ ধরা, কেনাবেচা ও পরিবহনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন জেলে, আড়তদার, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। তবে নদীতে মাছ আসতে শুরু করলেও এখনো কমেনি ইলিশের দাম। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বড় আকারের ইলিশ।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা মাছ ঘাটে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকেই ইলিশ ধরতে পদ্মা-মেঘনায় নামতে শুরু করেন জেলেরা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে থাকেন তারা। হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছ ঘাটে একের পর এক জেলেনৌকা ভিড়তে দেখা যায়। নৌকা থেকে প্লাস্টিকের ট্রেতে করে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নামিয়ে আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন জেলেরা।

হরিণা মাছ ঘাটে ছোট-বড় প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে জেলেরা মাছ এনে স্তূপ করে রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁকডাকের মাধ্যমে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ঘাটে মাছ সংরক্ষণ করে বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলক কম। একদল খুচরা ব্যবসায়ী শহরের বাজারে বিক্রির জন্য এবং অন্য ব্যবসায়ীরা বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে সরবরাহের উদ্দেশ্যে তাজা ইলিশ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

ঘাটসংলগ্ন গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে নদীতে নেমে শুক্রবার ভোরে ঘাটে ফিরে ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন তিনি। এভাবে মাছ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। মৌসুমের বাকি সময়জুড়ে নদীতে ইলিশের ভালো প্রাপ্যতা থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।

জেলে আবুল কালাম খান বলেন, সাতজন মিলে মধ্যরাতে নদীতে নেমেছিলেন তারা। ধরা পড়া ইলিশ বিক্রি করেছেন ১৫ হাজার টাকায়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও মাছ ধরতে নদীতে নামবেন। তবে কয়েক দিন পর ইলিশের প্রাপ্যতা কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

ইলিশের দাম সম্পর্কে ঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বাজারে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা, ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ইলিশের পাশাপাশি কিছু জেলে পাঙাশ মাছও পাচ্ছেন। বড় আকারের পাঙাশ প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট আকারের পাঙাশ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আড়তদার মো. সেলিম বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে। আজ ও আগামীকাল পর্যন্ত মাছের সরবরাহের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে। কারণ, আগের বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দুই দিন মাছের সরবরাহ ভালো থাকলেও পরে তা কমে যেত।

আড়তদার ইব্রাহীম মিয়া বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে ঘাটে বড় আকারের ইলিশ তুলনামূলক বেশি আসছে। তবে ছোট আকারের ইলিশের সংখ্যা খুবই কম। ইলিশের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও পাঙাশ মাছ পাওয়ায় জেলেদের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে নদীতে ইলিশের বর্তমান প্রাপ্যতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন হরিণা মাছ ঘাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সৈয়াল। তিনি বলেন, আগে এ সময়ে নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। অভিযান পরিচালনা করেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। কারণ, একশ্রেণির অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মা ইলিশ শিকার করেছেন।

এ বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দুটি অভিযান কঠোরভাবে পরিচালিত হওয়ায় জেলেরা এখন এর সুফল পাচ্ছেন। ইলিশের পাশাপাশি নদীতে পাঙাশও পাওয়া যাচ্ছে। পাঙাশের উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধির জন্য সরকারিভাবে পরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ করা হলে মাছটি ইলিশের মতোই জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

আরও পড়ুন