
একীভূত প্রক্রিয়ার আওতায় পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের সব ধরনের চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা এবং পূর্ববর্তী সব চুক্তি নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের জমা টাকা পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলবে।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় এসেছে। গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত উত্তোলন করতে পারবেন।
যারা এখনই আমানত উত্তোলন করবেন না, তারা বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন এবং প্রয়োজনে আমানতের বিপরীতে ঋণ নিতে পারবেন। তবে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে স্থায়ী আমানতের টাকা তোলা যাবে না।
বর্তমানে জমা থাকা অর্থের বিপরীতে গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন। আর নতুন করে জমা দেওয়া আমানতের ক্ষেত্রে এ সুবিধা থাকবে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ অনুযায়ী, রেজল্যুশন স্কিম কার্যকর হওয়ার দিন থেকে নতুন কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হস্তান্তর হওয়া ব্যাংকগুলোর নামে থাকা সব ব্যাংকিং কাগজপত্র বৈধ থাকবে।
অর্থাৎ আগের ব্যাংকের নামে ছাপানো বা ব্যবহৃত চেকবই, ডিপোজিট স্লিপ, টাকা উত্তোলনের স্লিপ, ভাউচার, ফরম, রসিদ ও আবেদনপত্র—সবই এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত ও বৈধ দলিল হিসেবে গণ্য হবে। ফলে গ্রাহকদের আপাতত নতুন কোনো কাগজপত্র নিতে বা পরিবর্তন করতে হবে না।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকে কর্মরত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে যুক্ত হবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনে চাকরির শর্তাবলি পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। তবে কেউ লিখিতভাবে চাকরি না করার ইচ্ছা জানালে তিনি ইস্তফা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে।
বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধনে রূপান্তর করা হবে। তবে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, জয়েন্ট ভেঞ্চার, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বিদেশি দূতাবাস এ বিধানের বাইরে থাকবে।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জালিয়াতির মাধ্যমে ডজনখানেক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ তুলে নেয়। এসব অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির চাপেই অনেক ব্যাংক ধীরে ধীরে গভীর সংকটে পড়ে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে এসব ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরের বেশি সময় ধরে তারল্য সহায়তা দিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
এ অবস্থায় আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ অনুযায়ী গত ৫ নভেম্বর পাঁচটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে এগুলো একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে।
সারা দেশে এসব ব্যাংকের রয়েছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ। একীভূত হওয়ার পর একই এলাকার একাধিক শাখা একত্র করে একটি বা দুটি করা হবে।
ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমাতে ইতোমধ্যে কর্মীদের বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নতুন ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন জোরদার করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।










