
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ এর খসড়া ২৭ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করে ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মতামত প্রদানের সময় নির্ধারণ করাকে প্রহসনমূলক বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ইতোমধ্যে ‘‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’’ সহ বেশকিছু আইনের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘন করে সম্পূরক কার্যসূচি হিসেবে বিল উত্থাপন ও তড়িঘড়ি করে আইন পাশের অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। আলোচ্য খসড়াটির ক্ষেত্রেও একইভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত হিসেবে আশঙ্কা প্রকাশ করে গুমের ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত ও মতামত প্রদানের সময় কমপক্ষে দুই সপ্তাহ বৃদ্ধি করে প্রাপ্ত সুপারিশের আলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় খসড়াটি ঢেলে সাজাবার জোর দাবি জানাচ্ছে সংস্থাটি।
প্রকাশিত খসড়া আইনের ওপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আজ এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া আইনটিতে বেশকিছু ইতিবাচক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেমন- গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি ও চলমান অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি; ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নির্দেশদাতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা; গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা অন্য ধরনের অজুহাতকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা; ইত্যাদি। তবে অংশীজনদের মতামত প্রদানের জন্য মাত্র একদিনের সময় প্রদান করায়, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি আইনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও অংশীজনদের মতামত সংগ্রহের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে। তা ছাড়া, ইতিমধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন পাশের ক্ষেত্রে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও আমাদেরকে শঙ্কিত করে তুলেছে যে, আলোচ্য খসড়াটির ক্ষেত্রেও একইভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতার অপব্যবহারের চর্চা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ।’
প্রস্তাবিত খসড়ায় গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে পুলিশের ওপর এককভাবে ন্যস্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষে কতটা নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থেকে গুমের ন্যায় স্পর্শকাতর বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব, সেই প্রশ্ন রেখে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দেশে গুমের যত ঘটনা ঘটেছে, তার সিংহভাগের সঙ্গে পুলিশ, গোয়েন্দা তথা নিরাপত্তাসংস্থা ও শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের একাংশের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে গুমের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো। অথচ বিপুল জনরায়ে অভিষিক্ত ক্ষমতাসীন সরকার, বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে যাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীসহ সাধারণ নাগরিকের শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে গুম ও হত্যার শিকার হওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের পক্ষে এ রকম বিধানসহ আইনের খসড়া কীভাবে প্রণীত হতে পারে! তাহলে কী আমরা ধরে নিবো যে, কর্তৃত্বপরায়ণ আমল থেকে বর্তমানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক মহল কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি?’
খসড়া আইনের ধারা ১৫ এর উপধারা (১) ও (২) উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, ‘বিদ্যমান বাস্তবতায় অধস্তন একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিপক্ষে ‘‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন’’ প্রস্তুত ও দাখিল করা আদৌ কী সম্ভব হবে? একইসঙ্গে অধস্তনের এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্তোষজনক কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া না গেলে, সেক্ষেত্রে এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন, মর্মে যে বিধান যুক্ত করা হয়েছে, এর ফলে প্রস্তাবিত আইনটির মাধ্যমে দৃশ্যত ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। যা আসলে কর্তৃত্ববাদী চর্চা অব্যাহত রাখা এবং বাস্তবে অভিযুক্তদের সুরক্ষা নিশ্চিতের আইনি সুযোগ তৈরি হবে। তা ছাড়া, এ ধরনের বিধান অব্যাহত রাখা হলে গুমের ঘটনা বিবেচনায় প্রকৃতার্থে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মাধ্যমে গুমের ঘটনায় সরকারি ভাষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করার ঘটনা ঘটবে।’
সরকারি ও বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় প্রতিটি দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিবর্গ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে গুমের শিকার হয়েছেন, অনেকের শেষ পরিণতি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু জানা সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের গুরুত্ব এবং এ সংক্রান্ত একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের স্বার্থে ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত সংগ্রহের সময়ের ব্যাপ্তি দুই সপ্তাহ বৃদ্ধিসহ তাদের প্রদত্ত মতামত, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের আলোকে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার প্রতিফলন ঘটিয়ে খসড়াটি প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন করা হবে বলে প্রত্যাশা করছে টিআইবি।










