শনিবার ৯ মে, ২০২৬

সন্তানের আকিকা কি কোরবানির পশুতেই দেওয়া যাবে? জানুন ইসলামি বিধান

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

RisingCumilla - goat
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি। আত্মত্যাগ, আল্লাহভীতি ও প্রভুর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন এই ইবাদত। এর সূচনা হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে।

পরবর্তীতে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা কোরবানিকে এনে দেয় অনন্য মর্যাদা ও তাৎপর্য। সেই শিক্ষা কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মুমিনের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

পবিত্র ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান আমল হচ্ছে পশু কোরবানি করা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার এই ইবাদত সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর ওপর ওয়াজিব। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে—কোরবানির পশুতে সন্তানের আকিকার অংশ দেওয়া যাবে কি না?

ইসলামি শরিয়তের আলোকে এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ দেওয়া জায়েজ। কারণ কোরবানি ও আকিকা—উভয়টিই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আদায় করা ইবাদত। তাই একই পশুতে কোরবানি ও আকিকার নিয়ত একসঙ্গে করা বৈধ।

ইসলামি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ রয়েছে, উট, গরু ও মহিষের মতো বড় পশুতে সাতজন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি করা যায়। একইভাবে এসব পশুতে কোরবানির পাশাপাশি আকিকার অংশও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। যেমন, একটি গরুতে চারজন কোরবানির নিয়তে শরিক হলে বাকি দুই বা তিন অংশ আকিকার জন্য রাখা যেতে পারে। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬)

তবে শরিকে কোরবানির ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারের অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ কম বা বেশি হলে কারও কোরবানি শুদ্ধ হবে না। যেমন—কেউ আধা ভাগ আর কেউ দেড় ভাগ নিলে তা জায়েজ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৭)

ফিকহবিদরা আরও বলেন, কোরবানির গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হওয়া বৈধ। এতে কোরবানি ও আকিকা—উভয়টিই আদায় হয়ে যাবে। ছেলের আকিকার জন্য দুই অংশ এবং মেয়ের জন্য এক অংশ নির্ধারণ করতে হবে। (ইলাউস সুনান: ১৭/১২৬)

ফাতাওয়া শামি ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ফিকহগ্রন্থেও কোরবানির সঙ্গে আকিকা সহিহ বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। (রাদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬; হাশিয়াতুত তহতাভি আলাদ্দুর: ৪/১১৬)

আকিকা কী এবং কেন করা হয়

‘আকিকা’ শব্দের অর্থ কাটা, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা এবং সন্তানের জন্য সদকা দেওয়া। ইসলামি পরিভাষায় নবজাতকের পক্ষ থেকে পশু জবাই করাকে আকিকা বলা হয়।

অনেক আলেম আকিকাকে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাতি হাসান ও হুসাইনের পক্ষ থেকে একটি করে বকরি জবেহ করেছিলেন। (আবু দাউদ)

অন্য এক বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) দুটি বকরি জবেহ করেছেন। ইমাম মালেক (রহ.) তার ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“যার সন্তান জন্ম নেয়, সে যদি সন্তানের পক্ষ থেকে আকিকা করতে চায়, তবে তা করা উচিত।”

তিনি আরও বলেন— “প্রত্যেক সন্তান তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে আকিকা কর, নাম রাখ এবং মাথার চুল মুণ্ডন কর।” (তিরমিজি)

আকিকায় কতটি পশু দিতে হয়

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, ছেলের জন্য দুটি বকরি এবং মেয়ের জন্য একটি বকরি আকিকা করা সুন্নত।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে— “ছেলের পক্ষ থেকে দুটি এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা করা সুন্নত।”

সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। তবে সম্ভব না হলে ১৪তম কিংবা ২১তম দিনেও করা যায়।

হজরত বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— “সপ্তম দিন, অথবা চতুর্দশ দিন, অথবা একুশতম দিনে আকিকা কর।” (তিরমিজি)

আকিকার গোশতের বিধান

আকিকার গোশত শিশুর মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই খেতে পারবেন। আত্মীয়স্বজন ও গরিবদেরও খাওয়ানো যাবে। তবে পশুর চামড়া বা মাংস বিক্রি করা যাবে না এবং পশুর কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবেও দেওয়া যাবে না।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে—

“আকিকার গোশত নিজে খাবে, অন্যকে খাওয়াবে এবং কিছু সদকা করবে।” (মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৬৬৯)

আরও পড়ুন