রবিবার ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

শীতের সকাল: হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিন

লেখক: নাজাফ উদ্দীন ইমন

Rising Cumilla - Najaf Uddin Emon
নাজাফ উদ্দীন ইমন / ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশকে বলা হয় ষড়ঋতুর দেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই মিলে আমাদের ছয় ঋতু। ছয় ঋতুর এ দেশে শীত আসে চুপিচুপি, কুয়াশার চাদরে পৃথিবীটাকে ঢেকে দিয়ে। আমাদের প্রকৃতি তখন এক বিচিত্র সৌন্দর্যে ভরে ওঠে, যার বর্ণনা দিতে গিয়ে কত কবি যে থমকে গেছেন, তার কোনো হিসেব নেই। শীতের উপকারিতা নিয়ে অনেক আলোচনা করা যায়, তবে এ ঋতুর চমকপ্রদ অধ্যায় নিয়েই কথা বলা যাক। শীতকালের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় হলো এর সকাল।

একসময় শীতের সকাল মানেই ছিল প্রকৃতি আর মানুষের এক আন্তরিক মিলন। ভোরের আলো যখন কুয়াশাকে ভেদ করে পৃথিবীতে নেমে আসে, মনে হয় যেন এক প্রেমিক সব বাধা উপেক্ষা করে তার প্রিয়জনের দিকে ছুটে আসছে। এই মৃদু আলো ছিল মানুষের সকালের প্রথম সঙ্গী, প্রথম শান্তি।

সেকালে মানুষ ঘুম থেকে উঠত খুব ভোরে, কোনো মোবাইল এলার্মে নয়, বরং হাঁস-মুরগির ডাক, রান্নাঘরে মায়ের আসবাবপত্রের শব্দ, আর গোয়ালের গরুর ডাক, ভেজা প্রভাতের বাতাসে। কৃষকরা যেত ক্ষেতে, গোয়ালীরা যেত গরুর দুধ নিতে, আর কেউবা কুয়াশা ভেদ করে খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে যা ছিল সেকালের কফি। এভাবেই ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই সবাই যার যার দৈনন্দিন কাজে মনোনিবেশ করত।

নাস্তায় থাকত আমন ধানের চালের হরেক রকমের পিঠা পুলি, পায়েশ, আর রান্নাঘরের ধোঁয়া লাগা উষ্ণতা। উঠোনে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে হরেক রকমের খাবার খাওয়াটা ছিল রোজকার আনন্দ, প্রতিদিনের সৌন্দর্য। গ্রামের শিক্ষিত সচ্ছল প্রবীণরা এক কাপ আদা-চা হাতে পড়তেন পত্রিকা। সকালের রুটিন ছিল সরল, কিন্তু পূর্ণতা ছিল সেই সরলতার ভেতরেই।প্রযুক্তিহীন দিনগুলোও কতটা রোমাঞ্চকর হতে পারে, সেকালের শীতের সকাল ছিল তার সাক্ষী।

সময় বদলেছে, উন্নয়ন আর বিবর্তনের কবলে বদলে গেছে শীতের সকালও। একালের সকাল শুরু হয় মোবাইলের এলার্মে। ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথেই চোখ পড়ে মোবাইলের স্ক্রিনে যা সেকালের ভোরের সূয্যিমামার স্নিগ্ধ আলোর অনুভূতিকে উপেক্ষা করে। সকাল মানেই হয়ে গেছে নোটিফিকেশন চেক করা, সোশ্যাল মিডিয়ার হাল দেখা, আর তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছাড়ার চেষ্টা। নাস্তা? গ্রামের উঠোনে রোদ মেখে নয়, অফিসের পাশের টং দোকানের চা-পাউরুটি, কিংবা একটু স্বচ্ছল হলে পাশের রেস্তোরাঁর স্যান্ডউইচ। ব্যস্ত শহুরে জীবনের মানুষ যান্ত্রিকতা আর উন্নয়নের আবরণে সকালকে আর উপভোগ করে না। তাদের চোখে কুয়াশা নেই,কানে নেই হাঁস-মুরগির ডাক,ত্বকে নেই রোদের প্রথম উষ্ণতা।

প্রযুক্তি মানুষের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে সকালের সেই নির্মল অবকাশ, বিনিময়ে দিয়েছে অতিবেগুনী আলো ছড়ানো এক স্ক্রিন, যা রোদের মতো উষ্ণ নয়, বরং ক্লান্তি ও ক্ষতিকর। যার দরুন মানুষ হচ্ছে অলস, নিরস এবং নির্ভরশীল যা জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে আনন্দ, অনুভূতি আর চাঞ্চলতা। প্রযুক্তির করাতলে বিলুপ্ত হচ্ছে মানুষের অতীত গাম্ভীর্য, হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ।

শীতের সকাল আজও সুন্দর, প্রকৃতি আজও উদার। কিন্তু মানুষের মন বদলে গেছে। উপভোগ করার সেই মন আজ আর নেই, যে মন কুয়াশার মধ্যে আলো খুঁজত, মাঠের শিশিরে পা ভেজাত, নরম রোদে বসে নাস্তার স্বাদ নিত। তবু কিছু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ আছেন, যারা আজও শীতের সকালকে অনুভব করেন আগের মতোই। তাদের চোখে কুয়াশা এখনও কবিতা, ভোরের রোদে এখনও প্রেমে পড়ে,আর শীতের সকাল এখনও রোমাঞ্চকর এক নির্জন সৌন্দর্য। প্রকৃতি তার আপন নিয়ম মেনেই চলছে, বদলেছে মানুষের জীবনের গতি, বদলেছে আমাদের তাকানোর দৃষ্টি।

 

নাজাফ উদ্দীন ইমন
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
আরও পড়ুন