বুধবার ৭ অক্টোবর, ২০২৬

ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নতুন মুখ নেহা বোরা, কে এই তরুণী

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - Neha bora
নেহা বোরা/ছবি: সংগৃহীত

ভারতে বিজেপির ক্ষমতায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলা এবং সাম্প্রতিক উপনির্বাচন ঘিরে সহিংসতার অভিযোগের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন নকশালপন্থি দল সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা। বিভিন্ন ছাত্র ও গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি বর্তমানে ভারতের যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে নেহা বোরা নতুন করে আলোচনায় আসেন। মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময়ও তাকে সক্রিয় দেখা যায়। ওই আন্দোলনে অভিজিৎ দীপ ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি নেহাও অনশনে অংশ নেন।

একের পর এক আন্দোলনে নেহা

নেহা বোরা যে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন ছয়জন। তাদের মধ্যে বিহার ও ঝাড়খণ্ডে চারজন বিধায়ক এবং বিহারের কারাকাট ও আরা আসনে দুজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।

আইসা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি করে আসছে। নেহা বোরা সংগঠনটির নেতৃত্বে থেকে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও গণআন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।

নিট ইস্যুতে আন্দোলনের পর ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনেও অংশ নেন তিনি। আন্দোলনে যোগ দিতে রাঁচিতে গেলে তার মুখে কালি ছোড়ার ঘটনা ঘটে।

তবে এতে দমে যাননি নেহা। সে সময় তিনি বলেন, মুখে কালি ছুড়ে তাকে ভয় দেখানো যাবে না। দিল্লির আন্দোলনে তিনি প্যালেট গান ও লাঠিচার্জেরও মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি করেন।

তার প্রশ্ন ছিল, কালি ছুড়ে কি সারা দেশের ছাত্র-যুবকদের ক্ষোভ দমন করা সম্ভব?

পরবর্তী সময়ে বিহারে গিয়ে আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতেও সরব হন তিনি। এসব ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেহা বর্তমানে ভারতের চলমান যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও আন্দোলন

বর্তমানে দিল্লিতে সমর্থকদের নিয়ে আবারও আন্দোলনে নেমেছেন নেহা বোরা। এবার তার আন্দোলনের অন্যতম দাবি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও আন্দোলন জোরদার হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদপত্র ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।

উত্তরাখণ্ড থেকে দিল্লির ক্যাম্পাসে

নেহা বোরা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, দিল্লি থেকে এমএ সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউতে বামপন্থি ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় নেহা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে তাকে নিয়মিত দেখা যায়।

তার দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্টভাষী বক্তব্য এবং প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার বক্তৃতার বিভিন্ন ভিডিও ও রিল ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজেপি সমর্থক পরিবার থেকে বামপন্থি রাজনীতিতে

নেহা বোরা এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সমর্থন রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিজেপির কট্টর সমর্থকও রয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

তবে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তিনি স্পষ্ট। তার ভাষায়, আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল কোনো একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নয়; বরং তরুণদের মধ্যে পারস্পরিক সংহতি তৈরি করা এবং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই করা।

নেহার মতে, তরুণ প্রজন্মকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরিবর্তে একে অপরের জন্য লড়াই করতে হবে। তার প্রত্যাশা, যন্তর-মন্তরের আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া শক্তি এসআইআর, ডিলিমিটেশন, শ্রমিক অধিকার ও নারীদের সংরক্ষণের মতো বিভিন্ন ইস্যুর আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়বে।

তার কাছে এসব আন্দোলন গণতন্ত্র এবং ভারতের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ।

অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা, নেহার জবাব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে নেহা বোরা ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে নিয়ে তুলনামূলক আলোচনাও শুরু হয়েছে। কে বেশি ‘ম্যাচিউর’—এমন বিতর্কে এক্সে এক ব্যবহারকারী নেহার প্রশংসা করেন এবং তাকে জেন-জি প্রজন্মের আইকন হিসেবে উল্লেখ করেন।

ওই পোস্টটি শেয়ার করে অভিজিৎ দীপক লেখেন, তিনি এর সঙ্গে একমত।

এরপর নেহা বোরা এক্সে লেখেন, ‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।’

জবাবে অভিজিৎ দীপক লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’

এর আগে সিজেপির আন্দোলনের সময় যন্তর-মন্তরে দেওয়া এক বক্তব্যে নেহা দীপকের প্রশংসা করে বলেছিলেন, তিনি বিনয়ী এবং অন্যদের পরামর্শ গ্রহণে প্রস্তুত। আন্দোলনকারীদের তিনি বোঝাতে পেরেছেন যে তিনিও তাদের মতোই এই সংগ্রামের একজন শিক্ষার্থী ও সহযোদ্ধা।

আরও পড়ুন