
সিটি করপোরেশন এলাকায় শৃঙ্খলা ফেরানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না। পাশাপাশি একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ১২০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করা হয়।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, বর্তমানে চলাচলরত ও নতুন—উভয় ধরনের ই-রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবিষয়ক বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সনদ গ্রহণ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। প্লেটটি ই-রিকশার দৃশ্যমান স্থানে রাখতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। এই মেয়াদ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
নির্ধারিত রুটে চলবে ই-রিকশা, গতিসীমা সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার
ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে এলাকাভিত্তিক জোন, নির্দিষ্ট রুট, ই-রিকশার সংখ্যা ও রং নির্ধারণ করবে। এক সিটি করপোরেশনের অধীনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করতে পারবে না।
যাত্রীদের নিরাপত্তায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা থাকবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চলাচলের প্রধান সড়ক, ফুটপাত এবং প্রশাসনের নিষিদ্ধ ঘোষিত সড়কে ই-রিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যাত্রী বহন ও নিবন্ধন ফি নির্ধারণ
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার আকারভেদে চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহনের বিধান রাখা হয়েছে। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি অন্য কোনো মালামাল বহনের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করা যাবে না।
বিধিমালার তফসিল অনুযায়ী, ১২ জন যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। এর বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ২৪ জন যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফিটনেস সনদের জন্য ফি দিতে হবে ১ হাজার টাকা। নিবন্ধন ও নবায়ন থেকে প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের রাজস্ব হিসেবে জমা হবে।
বৈধ চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিধান
অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বৈধ ও নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব স্টেশনে সোলার প্যানেল ও নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রিডের সংযোগ তৈরি করতে হবে।
এ ব্যবস্থায় দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। তবে অননুমোদিত স্থানে চার্জ দেওয়া কিংবা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নির্দেশনা
পরিবেশদূষণ রোধে ই-রিকশার ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহার কারখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানো যাবে না।
এ ছাড়া অকার্যকর ব্যাটারি খোলা জায়গায়, মাটিতে, জলাশয়ে কিংবা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা যাবে না। এসব ব্যাটারি পোড়ানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নিয়ম ভাঙলে নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা
বিধিমালায় নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, নিষিদ্ধ সড়কে চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো, উল্টোপথে চলা এবং ট্রাফিক সংকেত অমান্য করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ই-রিকশা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন ও কার্যক্রম তদারকিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ, বুয়েট, সিটি করপোরেশন, পুলিশ ট্রাফিক বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পাশাপাশি সরকার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিধিমালা অনুসরণ করে ই-রিকশা উৎপাদন এবং চালকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।








