
বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের পর এবার প্রবাসীদের জন্য নতুন করে চালু করা হচ্ছে প্রবাসী কার্ড। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রবাসী নাগরিকদের হাতে এই কার্ড চালু হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে গত রোববার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্সে উৎসাহ যোগাতেই সরকার এই প্রবাসী কার্ড চালু করতে যাচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবে এই কার্ড চালু হলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, সেটি নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে প্রবাসী নাগরিকদের মধ্যে।
এর আগে থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার ইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং কার্ড বা বিএমইটি কার্ড চালু রয়েছে।
মূলত বৈধভাবে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) নিবন্ধিতরা এই কার্ড পেয়ে থাকেন।
এই কার্ডধারী শ্রমিকের সব তথ্য সরকারি তথ্যভাণ্ডারে জমা থাকে। ফলে কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে তাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায় এবং তৎক্ষণাৎ সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে।
আগে থেকে প্রবাসীদের জন্য বিএমইটি কার্ড থাকার পর নতুন করে চালু হচ্ছে প্রবাসী কার্ড। এই কার্ডে বাড়তি কি সুবিধা থাকবে, এই প্রশ্নও রয়েছে প্রবাসী নাগরিকদের মধ্যে।
এর জবাবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, বিএমইটি কার্ডের সঙ্গে নতুন ব্যাংকিং বা আর্থিক বিষয়টিও যুক্ত করা হবে প্রবাসী কার্ডে। এছাড়া বাড়তি কিছু সুবিধা মিলবে এই কার্ডের মাধ্যমে।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, বিএমইটি কার্ডে যে তথ্যগুলো আছে, প্রবাসী কার্ডেও সেই বিষয়গুলো থাকবে। তবে এই কার্ডে আরো বাড়তি কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে, সেই সঙ্গে ব্যাংকিং সিস্টেমও যুক্ত থাকবে এই কার্ডে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে যে বিএমইটি কার্ড দেওয়া হয়েছিল, সেটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের খুব একটা কাজে আসেনি। নতুন করে এই কার্ড চালু করা হলে সেটিতে যেন নাগরিকরা সত্যিকারে উপকৃত হয়, সেই চিন্তাও করতে হবে সরকারকে।
প্রবাসী কার্ড কী এবং কেন?
মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সব প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে তার সঠিক সংখ্যা সরকারের কাছেও নেই।
তবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, সেই হিসাবে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা অন্তত দেড় কোটি। এর বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি আছে কিন্ত তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ নতুন নতুন অনেক কার্ড চালু করেছে। যার ধারাবাহিকতায় নতুন করে প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রবাসী কর্মীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কার্ডটি প্রবাসীদের জন্য একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও সেবা কার্ড হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সুবিধা পাবেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, ‘প্রবাসী নাগরিকরা এই কার্ড পাসপোর্টের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করতে পারবে, যে কোনো সময় যে কেউ তার সম্পর্কে জানতে চাইলে একটা কিউআর কোড থাকবে, যেটি স্ক্যান করলে প্রবাসী নাগরিকদের বিস্তারিত দেখা যাবে এবং এই কার্ড মোবাইলের মাধ্যমেও ব্যবহার করা যাবে, কার্ডধারীকে সঙ্গেও রাখতে হবে না।’
নির্বাচনের আগে বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ‘প্রবাসী কার্ড’ দেওয়া হবে, যাতে তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষণ থাকবে এবং এতে ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়েতে যুক্ত থাকবে, সহজ রেমিট্যান্স প্রেরণের সুবিধাও যুক্ত থাকবে।
যে সুবিধা থাকবে
বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই চালু হয়েছিল বিএমইটি কার্ড। এই কার্ড ছাড়া কোনো শ্রমিক বৈধভাবে বিদেশ যেতে পারবে না।
বিএনপির ইশতেহার অনুযায়ী, এই প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা পাওয়া যাবে এবং দেশে ফেরত প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা হবে।
প্রবাসী নাগরিকেরা বলছেন, তাদের অনেকেই এখনো জানেন না এই কার্ডটি পেলে তারা কি সুবিধা পাবেন বা তাদের জন্য এই কার্ড কতখানি জরুরি।
মালয়েশিয়া প্রবাসী শাহরিয়ার তারেক বলেন, ‘বিএমইটি কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন। তারপরও অনেক প্রবাসীই বিমানবন্দর কিংবা বাংলাদেশে নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন। তাদের কাছেও এটি একটি বড় প্রশ্ন যে এই কার্ড আসলে তাকে কতখানি সুরক্ষা দিবে’।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, এই কার্ডের বড় একটা দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক।
এর ব্যাখ্যায় তিনি জানান, যার কাছে এই প্রবাসী কার্ডে যে ব্যাংকিং সিস্টেম যুক্ত থাকবে, তাতে ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের সিস্টেমে ব্যবহার করা যাবে। সেক্ষেত্রে তিনি যে দেশে থাকেন, সেই দেশের মুদ্রায় তিনি খরচ করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশি টাকায়ও খরচ করতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘কোনো প্রবাসী যদি চান, তিনি তার কার্ড দিয়ে অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে ওই দেশ থেকে তার পরিবারকে কিছু কিনে দিতে, সেটাও এই প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে করতে পারবেন’।
প্রবাসী কার্ডটি চালুর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনেক সময় দেশের বাইরে যারা থাকে, তারা যে টাকা পাঠায় সেটি অনেক সময় তাদের নিকট আত্মীয় বা পরিবারের লোকেরা খরচ করে ফেলে। এই কার্ডটা চালু হলে পরিবার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খরচ করতে পারবে। আনলিমিটেড টাকা খরচ করতে পারবে না’।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, বিভাগীয় শহর থেকে জেলা শহর পর্যন্ত প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী সিটি গড়ে তোলা হবে। এক্ষেত্রে যাদের কাছে এই প্রবাসী কার্ড থাকবে তারা প্রবাসী সিটিতে আবাসন বা প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এর বাইরেও বর্তমানে বিএমইটি বীমা, আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ যে সব সুযোগ সুবিধা রয়েছে, সেগুলোও বহাল থাকবে প্রবাসী কার্ডে’।
তিনি জানান, আমরা চেষ্টা করবো যে নাগরিকদের হাতে এই কার্ড থাকবে, তিনি যখন বিমানবন্দরে যাবেন, তখন যেন তিনি এই কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে তার সম্মানটুকু পান কিংবা তিনি যেন হয়রানির স্বীকার না হন- সেই বিষয়গুলোও যুক্ত থাকবে এই কার্ডে।
কারা কিভাবে পাবেন, কতটা জরুরি?
এই কার্ড নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে কিছু ধোঁয়াশাও রয়েছে। তার প্রথমটি হলো অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে পরে আবার কর্মসংস্থানে জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের বেশিরভাগের নেই এই বিএমইটি কার্ড।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইশতিয়াক আসিফ বলেন, ‘প্রবাসীরা যে পাসপোর্টে যে দেশে আছেন, সেই দেশের ভিসা আছে। তাহলে কেন আলাদা করে সুযোগ সুবিধা পেতে প্রবাসী কার্ড নিতে হবে। তারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, এটাই কি যথেষ্ট নয় রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে’?
এর জবাবে মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সব প্রবাসীরা রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রবাসীর তথ্য সরকারের কাছে আছে। সরকার যখন এই কার্ডটিতে বিশেষ সুবিধা দিবে তখন হয়তো অনেকেই এই কার্ডটি গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে।
প্রতিমন্ত্রী নূর জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে যাদের বিএমইটি কার্ড আছে, তাদেরকেই দেওয়া হবে প্রবাসী কার্ড। এক্ষেত্রে সেই কার্ডধারীদের নতুন করে প্রবাসী কার্ড নিতে রেজিস্ট্রেশন করানোর চিন্তা ভাবনা রয়েছে সরকারের।
এক্ষেত্রে কোনো ফি দিতে হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী মি. নূর বলেন, ‘আগে বিএমইটি কার্ড করতে একটি ফি লাগতো। যাদের বিএমইটি কার্ড আছে তাদের ফি নাও লাগতে পারে। নতুন যারা যুক্ত হবে তারা ফি দেওয়ার মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে এই কার্ড পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে নতুনদের রেজিস্ট্রেশন ফি’র প্রয়োজন হতে পারে’।
তিনি জানান, এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসীদের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, আগে যে বিএমইটি কার্ড দেওয়া হয়েছিল, সেটা আসলে কোনো কাজে আসেনি। সেই কার্ডেও অনেক কিছু ছিল। ভাবা হয়েছিল ওটা দিয়েই সে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবে, দেখতে পারবে, এগুলো কিছুই সেভাবে হয়নি’।
যে কারণে নতুন করে প্রবাসী কার্ড চালু করার আগে সেটি কতখানি কার্যকর করা যাবে, সেটি নিয়েও ভাবার পরামর্শ দিচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ।








