
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক মাইলফলক সৃষ্টি করেছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী ড. আবদুল আল-সাইদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে তার বিজয় নিশ্চিত হয়। ডেট্রয়েটে নিজের নির্বাচনি প্রধান কার্যালয়ে সমর্থকদের উপস্থিতিতে বিজয় ভাষণ দেন ৪২ বছর বয়সী এল-সায়েদ। এ সময় উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মিশিগান, আমরা করে দেখিয়েছি! এই মহান অঙ্গরাজ্যের বিজয়ী সিনেটর হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সম্মানিত।’
অবসর গ্রহণ করতে যাওয়া ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন পেশায় চিকিৎসক আব্দুল এল-সায়েদ। তার এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৭ বছরের সিনেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মুসলিম প্রতিনিধি উচ্চকক্ষে নির্বাচিত হলেন। একই সঙ্গে ১৯৬৯ সালের পর প্রথম নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক চিকিৎসক সিনেটর হতে যাচ্ছেন তিনি।
এনবিসি নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের নির্বাচনি ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, মাইক রজার্সকে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পরাজিত করেছেন আল-সাইদ। নির্বাচনে তার বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে এই বিজয়ের পথ মোটেও সহজ ছিল না। নির্বাচনের আগে নিজ দলের ভেতরেই বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইপর্বে এল-সায়েদের কাছে পরাজিত হওয়া কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থনের ঘোষণা দেন। এরপরও প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হন এল-সায়েদ। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ দলের প্রভাবশালী প্রগতিশীল নেতাদের সমর্থন তার নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, পুরো নির্বাচনি প্রচারণায় এল-সায়েদকে ঘিরে আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালায় রিপাবলিকান শিবির। তাকে উগ্র ও ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সমালোচনা করা হয়। এমনকি তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব বিরূপ প্রচারণা উপেক্ষা করে ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন তিনি।
নির্বাচনি প্রচারণায় এল-সায়েদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সংস্কার। পেশায় চিকিৎসক হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার বক্তব্য ছিল, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর যেন সাধারণ মানুষকে বিপুল অঙ্কের চিকিৎসা বিলের বোঝা বহন করতে না হয়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাণিজ্যিক মুনাফার প্রভাব কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
এ ছাড়া মার্কিন রাজনীতি থেকে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো, কর্মজীবী মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো বিষয়গুলোও ছিল তার নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যু। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে মিশিগানের রক্ষণশীল এলাকাগুলোতেও ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তুলতে সক্ষম হন তিনি।
উল্লেখ্য, ১৭৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কোনো মুসলিম প্রতিনিধি দেশটির উচ্চকক্ষে নির্বাচিত হননি। এর আগে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একাধিক মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হলেও সিনেটে এবারই প্রথম সেই ইতিহাস তৈরি করলেন আব্দুল এল-সায়েদ। তার এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।










