বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট, ২০২৬

মুহূর্তেই তছনছ ভবন-গাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার নেপথ্যে কী

এএফপি

Rising Cumilla - Nepal and Tibet flash flood
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবারের আকস্মিক ভূমিধস ও বন্যায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে/ছবি: রয়টার্স

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবারের আকস্মিক ভূমিধস ও বন্যায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। পাহাড় থেকে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে কয়েক তলা ভবন তলিয়ে দিয়েছে। ভেসে গেছে বাস, গাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি বলে জানা গেছে।

সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক তলা উঁচু একটি ভবনের ওপর মুহূর্তের মধ্যে কাদা-পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল ঢল আছড়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনটি পুরোপুরি তলিয়ে যায়। একই স্রোতে বাস ও গাড়িগুলোও খেলনার মতো ভেসে যেতে দেখা যায়।

ভূমিকম্প, নাকি ভূমিধস?

ভয়াবহ এই দুর্যোগের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে থাকতে পারে। ভূমিধসে একটি নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসে বিপুল পানির ঢল।

তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, ওই ভূমিকম্পের কারণেই ভূমিধস হয়েছে। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভূমিধসের কারণেই সেখানে ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) প্রাথমিক মূল্যায়নে সীমান্তের চীনা অংশে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ধরা পড়েনি। সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও ভূবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠের ধারণা, নেপালের অংশে পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতও হয়নি

দুর্যোগটির অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো—ঘটনার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকা ও আশপাশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করে দিতে পারে। পাহাড় থেকে দ্রুতগতিতে নেমে আসা কাদা-পানির ঢল এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে, দৌড়ে কিংবা গাড়িতে করে পালিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই প্রবল স্রোত অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো আচরণ করে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত উঁচু স্থানে উঠে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সম্ভব হলে অন্তত ২০ ফুট উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন হাতিম শরিফ।

আবারও ঢলের আশঙ্কা

নেপালের পাহাড়ি এলাকায় নদীগুলোর অনেক অংশই সরু। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিখের মতে, তুষারধস বা ভূমিধসে এসব নদীর গতিপথ আটকে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যেতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ আকস্মিক ঢল।

আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং আরও একটি বড় ঢলের আশঙ্কা করছেন। তাঁর মতে, উজানে এখনো নদীর গতিপথ কোথাও কোথাও আটকে থাকতে পারে। ফলে নতুন করে প্রবল পানির স্রোত নেমে আসার ঝুঁকি রয়েছে।

এরই মধ্যে কাদা ও পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়ক থেকে হতাহত ও জীবিতদের উদ্ধারে এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করছেন উদ্ধারকারীরা। নুয়াকোটসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা?

এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের নানা প্রমাণ রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের সরে যাওয়া এবং স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফ গলে যাওয়ার মতো পরিবর্তন ভূমিধস ও হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা বা জিএলওএফের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম নেপাল। হিমবাহ গলে তৈরি কোনো হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে বেরিয়ে গেলে মুহূর্তেই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

গত বছরের জুলাইয়েও চীনের গিয়িরং কাউন্টি থেকে নেমে আসা প্রবল ঢল নেপালের রসুয়া জেলায় আঘাত হেনেছিল। তবে বুধবারের দুর্যোগে জিএলওএফের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক খতিয়ে দেখবেন। ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’র মাধ্যমে বর্তমান উষ্ণ জলবায়ুতে এ ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনা কতটা বেড়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হবে। একই সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের আগের জলবায়ুর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে পরিবর্তনের প্রভাবও পর্যালোচনা করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের জটিল ভূপ্রকৃতি, গলতে থাকা হিমবাহ, বরফের পরিবর্তন এবং সরু নদীপথ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আকস্মিক ও বিধ্বংসী দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: এএফপি

আরও পড়ুন