মঙ্গলবার ১৭ মার্চ, ২০২৬

পথ কুকুর বা বিড়াল মেরে ফেললে দেশের আইনে কী শাস্তি আছে

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রাণি হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে, যা সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক পাবনার ঈশ্বরদীতে সদ্যজাত ৮টি কুকুরছানাকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে হত্যার ঘটনা এবং বগুড়ায় একটি বিড়ালকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা এই বিষয়কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আইনজীবীদের মতে, ২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইন অনুসারে এমন অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, কিন্তু মামলা দায়েরের জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যান।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদ কোয়ার্টার কমপ্লেক্সে গত রবিবার ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, অভিযুক্ত এক সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীর ছেলে কুকুরছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পানিতে ডুবিয়ে মারার কথা স্বীকার করেছে। এরপর অভিযুক্তের পরিবারের কোয়ার্টার বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে, এবং মা কুকুরটিকে চিকিৎসার জন্য প্রাণিসম্পদ দফতরে পাঠানো হয়েছে। ‘এটি অমানবিক এবং গর্হিত কাজ,’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপের জন্য প্রাণিসম্পদ দফতরকে অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে, বগুড়ার দত্তবাড়িয়ায় একটি বিড়ালকে জবাই করে হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. এমরান হোসেন আদমদিঘী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। অভিযুক্ত মোছাম্মত বুলবুলির বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে, এবং আদালতের নির্দেশে মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয়েছে। সংগঠনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ জানান, অভিযুক্তকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে এই ঘটনায়ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসব ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে, পথ কুকুর বা বিড়াল মারলে আইনে কী শাস্তি? ২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইনের ৬ ও ৭ ধারায় প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার মধ্যে অঙ্গহানি, বিষ প্রয়োগ বা অপ্রয়োজনীয় হত্যা অন্তর্ভুক্ত। আইনটি পোষ্য এবং মালিকবিহীন (পথ) প্রাণির জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘প্রথমবার অপরাধের জন্য ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা, এবং দ্বিতীয়বার দুই বছরের কারাদণ্ড সহ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। এটিই সর্বোচ্চ শাস্তি।’

তবে আইন প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিব মাহবুব জানান, মামলা দায়েরের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা অনুমোদিত ভেটেরিনারি সার্জনের লিখিত অভিযোগ দরকার। সাধারণ নাগরিক সরাসরি মামলা করতে পারেন না, যা আইনটিকে ‘দুর্বল’ করে তোলে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৪২৯ ধারা ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রাণির মূল্য ৫০ টাকার বেশি হলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে, কিন্তু পথ প্রাণির মূল্য নির্ধারণ কঠিন।

প্রাণি অধিকারকর্মীরা দাবি করছেন, আইনকে আরও শক্তিশালী করে সাধারণ নাগরিকদের মামলা করার সুযোগ দেওয়া দরকার। গত বছর ঢাকার মোহাম্মদপুরে বিষ প্রয়োগে কুকুর-বিড়াল হত্যার ঘটনা এবং ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে শতাধিক কুকুর নিধনের মতো ঘটনাগুলো এই দাবির পক্ষে যুক্তি যোগায়। ঢাকা থেকে ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ সংগঠনের সদস্যরা ঈশ্বরদী যাচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার জন্য।

আইনজীবীরা মনে করেন, ২০১৪ সালে আদালতের নির্দেশে কুকুর নিধন বন্ধ করে ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি চালু হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত নির্যাতনের ঘটনা থামানোর জন্য সচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের উন্নতি জরুরি। প্রাণি কল্যাণ আইনের লক্ষ্য প্রাণির প্রতি সদয় আচরণ প্রচার, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ না বাড়ালে এমন অমানবিক ঘটনা অব্যাহত থাকবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

আরও পড়ুন-

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতককে সারা রাত পাহারা দিল একদল কুকুর

আরও পড়ুন