
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচনী প্রচারণা বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে সব প্রার্থী, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে প্রচারণায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে—এমন বক্তব্য, বিদ্বেষমূলক প্রচার কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টারের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন ও রেকসিন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী জনসভা বা সমাবেশ আয়োজন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো বাধা নেই। তবে সভা-সমাবেশের দিন, তারিখ ও সময় অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে কোনো সভা-সমাবেশ করা যাবে না। সড়ক, মহাসড়ক বা জনপথে জনসভা কিংবা পথসভা করলে ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন। পাশাপাশি প্রার্থীর পক্ষে বিদেশে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ আয়োজনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিটি বিলবোর্ডের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১৬ ফুট ও প্রস্থ ৯ ফুটের বেশি হতে পারবে না।
ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আচরণবিধি অনুযায়ী—
ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন হতে হবে সাদা-কালো
ব্যানারের সর্বোচ্চ মাপ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট
লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের আয়তন সর্বোচ্চ এ-ফোর সাইজ
ফেস্টুনের সর্বোচ্চ মাপ ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি
ছবি ও প্রতীক ব্যবহারে বিধিনিষেধ
প্রচারণা সামগ্রীতে প্রার্থী নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবেন না। প্রার্থীর ছবি হতে হবে কেবল পোর্ট্রেট আকারে এবং ছবির আয়তন সর্বোচ্চ ৬০ সেন্টিমিটার বাই ৪৫ সেন্টিমিটার।
নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা তাদের প্রচার সামগ্রীতে শুধু দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা তিন মিটারের বেশি হতে পারবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারে শর্ত
প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রতিনিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন। তবে প্রচারণা শুরুর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সংশ্লিষ্ট পেজ, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ শনাক্তকরণ তথ্য জমা দিতে হবে।
অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঘৃণাত্মক, মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য প্রচার করা যাবে না। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারও নিষিদ্ধ। ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না।
সব প্রচার কনটেন্ট প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি বা শেয়ার করা যাবে না।
গুজব ও এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন ধারা যুক্ত করে এসব অপরাধকে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
শোডাউন ও যানবাহন মিছিল নিষিদ্ধ
নির্বাচনী প্রচারে বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো যান্ত্রিক বাহন নিয়ে মিছিল, জনসভা কিংবা শোডাউন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যানবাহনসহ বা যানবাহন ছাড়া কোনো ধরনের মশাল মিছিলও করা যাবে না।
রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কেউ হেলিকপ্টার বা আকাশযান ব্যবহার করতে পারবেন না। ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি বা প্রতীক উল্লেখ করার সুযোগও নেই।
এ ছাড়া প্রচারণায় তোরণ নির্মাণ কিংবা আলোকসজ্জা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
কঠোর শাস্তির বিধান
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা দল বিধি ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, দেড় লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এমনকি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে।








