
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তাবেদারমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই ঐতিহাসিক যাত্রালগ্নে তিনি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—দলমত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড় কিংবা সমতলে বসবাসকারী সবাই এই দেশের নাগরিক। প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। স্বনির্ভর, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কারণে দেশ একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। এই বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, জুয়া ও মাদকের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ। এ কারণে সারাদেশে জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, দেশের সব সাংবিধানিক ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি ও নিয়মে। দলীয় প্রভাব, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি কিংবা জোর-জবরদস্তির কোনো স্থান থাকবে না—আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।
আগামীকাল থেকে রোজা শুরু হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কোনো যুক্তি নেই। তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান, রমজানকে অতিরিক্ত মুনাফার মাস হিসেবে না দেখে পবিত্রতা রক্ষায় সচেতন থাকতে এবং দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে।
তিনি জানান, রমজানে ইফতার, তারাবি ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রতা অবলম্বনকে ঈমানি দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধে সচেতনতা প্রয়োজন।
তিনি জানান, দৃষ্টান্ত স্থাপনের অংশ হিসেবে বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধাও নেবেন না। এটিকে মহানবীর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শের প্রতিফলন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
যানজটকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনদুর্ভোগ লাঘব না হলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে একদিকে শহরমুখী চাপ কমবে, অন্যদিকে পরিবেশের উন্নতিও হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে তারাই হবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই।
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, মেধা ও দক্ষতা বিকাশে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। কর্মসংস্থান ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়েই সরকার কাজ শুরু করেছে।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি—সবার অধিকার এই সরকারের প্রতি সমান। দলমত ও ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—এই বিশ্বাস থেকেই বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান—এটাই সরকারের মূল দর্শন।








