বুধবার ২৯ জুলাই, ২০২৬

চান্দিনায় বর্ষায় জমজমাট গাছের চারার হাট, প্রকৃতিতে প্রাণের উৎসব

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

RisingCumilla -Bustling sapling market in Chandina during the monsoon—a celebration of life in nature.
চান্দিনায় বর্ষায় জমজমাট গাছের চারার হাট, প্রকৃতিতে প্রাণের উৎসব

বর্ষার রিমঝিম ঝরঝর শব্দে যেন ঘুম ভেঙেছে প্রকৃতির। স্নিগ্ধ বৃষ্টির জলের সতেজতায় চারপাশ ভরে উঠেছে এক নতুন প্রাণের অনাবিল আনন্দে। ঋতুরাজ বর্ষাকে বরণ করে নিয়ে আর রূপময় প্রকৃতিকে নতুন সাজে সাজাতে সারা দেশের মতোই কুমিল্লা চান্দিনায় এখন চলছে গাছ লাগানোর মহোৎসব। চান্দিনার আনাচে-কানাচে, পিচঢালা পথের দু’পাশে কিংবা গ্রামীণ বাড়ির সিক্ত আঙিনায় এখন কেবলই নতুন সবুজের সমারোহ। বর্ষার এই ভরা মৌসুমে প্রকৃতিকে নতুন করে ভালোবাসার এই মনোরম দৃশ্য মন কেড়ে নিচ্ছে পথচারী ও স্থানীয় অধিবাসীদের।

উপজেলার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর এবং একঝাঁক উদ্যমী তরুণের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে চান্দিনায় চলছে ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ অভিযান। উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পুকুর পার, খালের ধার, খেলার মাঠ ও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গায় শোভা পাচ্ছে নতুন রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির চারা। ফলজ, বনজ এবং ঔষধি, সব ধরনের প্রজাতির চারাই প্রাধান্য পাচ্ছে এই ব্যাপক সবুজ বিপ্লবে। বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আমড়া ও জামরুলের মতো সুস্বাদু ফলদ গাছের পাশাপাশি মেহগনি, নিম, অর্জুন, সেগুন ও আমলকীর মতো কাষ্ঠল ও ঔষধি চারার চাহিদাও চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিক ও স্বনামধন্য বিভিন্ন সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করছে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও বেশি বেগবান করে তুলেছে।

তবে শুধু সরকারি বা সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগেই সীমিত নেই এই সবুজ আয়োজন। বর্ষার আগমনকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হয়েছেন এই প্রাণের উৎসবে। প্রবীণ শিক্ষক, চঞ্চল শিক্ষার্থী, কঠোর পরিশ্রমী কৃষক, স্থানীয় ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ গৃহিণী, সব শ্রেণীর মানুষই নিজ নিজ উদ্যোগে মেতে উঠেছেন চারা রোপণের মহান ব্রতে। বাড়ির পাশের পতিত কিংবা অনাবাদী জমি, গ্রামীণ মেঠো পথ, পুকুরপাড় কিংবা বহুতল ভবনের ছাদের টবে শোভা পাচ্ছে গাঢ় সবুজ ও সতেজ সব চারা গাছ। স্থানীয় চারা বিক্রির নার্সারিগুলোতেও এখন দিনরাত প্রচণ্ড ব্যস্ততা। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাটে-বাজারে ও রাস্তার মোড়ে চলছে রকমারি চারার জমজমাট বেচাকেনা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পছন্দের চারা কিনে পরম মমতায় তা নিয়ে যাচ্ছেন নিজের ভালোবাসার চেনা ঠিকানায়।

গাছ যে মানুষের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ও পরম পরম বন্ধু, সে সত্য আজ চান্দিনাবাসী নতুন করে উপলব্ধি করছে। মানবজাতির বেঁচে থাকার মূল চালিকাশক্তি অক্সিজেন যোগানো থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় গাছের ভূমিকা অপরিসীম ও অতুলনীয়। বায়ুমণ্ডলের বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে প্রকৃতিকে নির্মল, বাসযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখা, মাটির ক্ষয় রোধ করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গাছের চেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। এই সহজ ও মহা সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করেই চান্দিনার সর্বস্তরের মানুষ প্রকৃতিকে নতুন আলোয় সুন্দর ও সার্থক করে তুলতে একজোট হয়েছেন।

এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশও এখন বেশ মুখরিত ও উৎসবমুখর। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আঙিনায় পরম যত্নে চারা রোপণ করছে এবং সেগুলোর যথাযথ যত্ন নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছে। বয়োজ্যেষ্ঠরা যেমন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও রোগমুক্ত সবুজ পৃথিবী রেখে যেতে চান, অনুজ তরুণরা ঠিক তেমনি প্রকৃতির এই হারানো রূপ ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চান্দিনার এই সম্মিলিত ও অপূর্ব উদ্যোগ কেবল কিছু চারা রোপণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপান্তরিত হয়েছে পরিবেশ সচেতনতার এক অভূতপূর্ব মহা জাগরণে।

বর্ষার টুপটাপ বর্ষণ আর মাটিতে প্রচুর আর্দ্রতা থাকার কারণে এই মৌসুমে রোপণ করা চারা খুব দ্রুত বাড়ে এবং মাটিতে শক্তভাবে শেকড় ছড়ায়। ফলে মানুষের এই আকুল প্রয়াস ও কষ্ট খুব শিগগিরই সফলতার মুখ দেখবে বলে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। চান্দিনার আকাশে-বাতাসে এখন সবুজ স্বপ্নের আকুল হাতছানি। আজ যে ছোট্ট চারাটি পরম অনুরাগে মাটিতে পোঁতা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে তা মহীরুহ ও বিশাল বৃক্ষ হয়ে মানুষকে দেবে শীতল ছায়াতল, রসময় ফল ও অমূল্য জীবনদায়ী অক্সিজেন। সর্বস্তরের মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ পদক্ষেপে চান্দিনা দিন দিন হয়ে উঠছে সবুজ, সতেজ ও প্রাণবন্ত এক স্বপ্নের জনপদ।

আরও পড়ুন