রবিবার ৮ নভেম্বর, ২০২৬

কুমিল্লার হোমনায় চাকরির নামে কম্বোডিয়ায় পাঠিয়ে প্রতারণা ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

Rising Cumilla - Cumilla Map
কুমিল্লা জেলা/ছবি: রাইজিং কুমিল্লা সম্পাদিত

কুমিল্লার হোমনায় কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক যুবকের কাছ থেকে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকা নেওয়ার পর তাকে বিদেশে মানবপাচার চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর ওই যুবককে একটি প্রতিষ্ঠানে আটকে রেখে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হয়। প্রায় দুই মাস নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।

এ ঘটনায় প্রতারণা ও মানবপাচারের অভিযোগে মো. মাসুদ রানা ও তার স্ত্রী মৌসুমি আক্তারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী যুবক কাউছার আহমেদ (২৬)। তিনি হোমনা উপজেলার উত্তর মনিপুর এলাকার বাসিন্দা।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি মো. মাসুদ রানা কাউছার আহমেদকে কম্বোডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে মাসিক এক লাখ টাকা বেতনে বৈধ চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ জন্য এক বছরের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার কথাও বলা হয়। তাদের কথায় বিশ্বাস করে বিভিন্ন সময়ে আসামিদের মোট ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকা দেন কাউছার।

অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকা এবং নগদে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই দ্বিতীয় আসামি মৌসুমি আক্তার কাউছারের কম্পিউটার দোকান থেকে নগদ ২ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর ছোট ভাই বাইজিদ উপস্থিত ছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই দফায় ভুয়া টিকিট, পরে কম্বোডিয়া যাত্রা

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর কম্বোডিয়া যাওয়ার জন্য কাউছারকে দুটি বিমানের টিকিট দেওয়া হয়। তবে টিকিট দুটি ভুয়া হওয়ায় বিমানবন্দর থেকে তাঁকে ফিরে আসতে হয়।

পরে একই বছরের ২১ অক্টোবর তাঁকে আবার কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। পরদিন সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত চাকরির কোনো অস্তিত্ব নেই। তাঁকে ‘Fancy Technology Co., Ltd.’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। সেখানে আটকে রেখে তাঁর চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানে আটকে রেখে বৈদ্যুতিক শকে নির্যাতন

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত কাউছারকে নিয়মিত মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হয়। তাঁর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে এসব নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ওই সময়ে কাউছারের পরিবারের কাছ থেকে ১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার আদায় করা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ টাকা। কিশোরগঞ্জের এক প্রবাসী এজেন্টের মাধ্যমে ওই অর্থ আদায় করে পাচারকারীদের কাছে পাঠানো হয় বলে মামলায় দাবি করেছেন বাদী।

কাউছারের অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁকে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে দীর্ঘদিন খাবার ও মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এমনকি তাঁর জীবন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন যুবক

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস আটকে থাকার পর ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কৌশলে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন কাউছার আহমেদ।

দেশে ফেরার পর আসামিদের কাছে দেওয়া টাকা ফেরত চাইলে তাঁরা প্রথমে নানা টালবাহানা করেন। পরে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইনে আদালতে মামলা

আদালতে দায়ের করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩-এর ৩১(ক), ৩১(খ) ও ৩১(ঘ) ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন বাদী।

মামলার সঙ্গে অর্থ লেনদেনের ব্যাংক রশিদ, আসামিদের দেওয়া ভিসা ও বিমানের টিকিট, কম্বোডিয়া থেকে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র এবং আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগের বার্তার অনুলিপি সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, প্রথম আসামি মো. মাসুদ রানা বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। তাঁর স্ত্রী ও মামলার দ্বিতীয় আসামি মৌসুমি আক্তার ধার্য তারিখ পর্যন্ত জামিনে রয়েছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. শামীম আহমেদ বলেন, মামলার অভিযোগের সমর্থনে অর্থ লেনদেন, ভুয়া ভিসা ও বিমানের টিকিট এবং বিদেশে আটকে রেখে নির্যাতনের বিষয়ে বিভিন্ন নথিপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

তবে মামলার অভিযোগগুলো এখনো বিচারাধীন। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন