সোমবার ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

কংক্রিটের শহরে গাছপালা যেভাবে মন ভালো রাখতে সাহায্য করে

লাইফস্টাইল ডেস্ক

Rising Cumilla - tree
প্রতীকি ছবি/সংগৃহীত

দ্রুতগতির নগরজীবন, যানজট, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং কাজের চাপ—সব মিলিয়ে মানসিক ক্লান্তি যেন মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত জীবনে নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়লেও মানসিক প্রশান্তি ফিরে পেতে প্রকৃতির সান্নিধ্য হতে পারে সহজ ও কার্যকর একটি উপায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছপালা ও সবুজ পরিবেশ মানুষের মানসিক চাপ কমাতে, মনোযোগ বাড়াতে এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নগরজীবনের নানা চাপের প্রভাব উঠে এসেছে। ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, শব্দদূষণ, যানজট এবং সবুজ উন্মুক্ত স্থানের অভাব মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শহরের গাছপালা, উদ্যান ও খোলা সবুজ জায়গা মানুষের জন্য স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করে।

গাছপালা যেভাবে মন ভালো রাখতে সাহায্য করে

গাছ ও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক কেবল অনুভূতির বিষয় নয়; এ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাও রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে এবং মেজাজ ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে। সবুজ পরিবেশে সময় কাটালে শরীরের চাপজনিত প্রতিক্রিয়া কমতে পারে এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়তে পারে।

জাপানে প্রচলিত ‘শিনরিন-ইয়োকু’ বা ‘বনস্নান’ পদ্ধতিতে বনের পরিবেশে সময় কাটানোর মাধ্যমে মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। গাছের পাতার মর্মর শব্দ, পাখির ডাক, ছায়াঘেরা পথ এবং প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরিবেশ মানুষের মনকে শান্ত করতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এর সুফল ব্যক্তি, পরিবেশ ও সময়ের ওপর নির্ভর করে। প্রকৃতির সান্নিধ্য মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হলেও গুরুতর মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।

কংক্রিটের কোলাহল থেকে সবুজের প্রশান্তি

শহরের যানবাহনের হর্ন, ধুলাবালি, জনসমাগম এবং ব্যস্ত কর্মপরিবেশ মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও অবসাদ তৈরি করতে পারে। প্রতিনিয়ত এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ফলে অনেকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তির ঘাটতি দেখা দেয়।

অন্যদিকে, গাছপালায় ঘেরা পরিবেশে কিছু সময় কাটালে দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতি পাওয়া যায়। পার্কে হাঁটা, গাছের ছায়ায় বসে থাকা কিংবা বারান্দার গাছের পরিচর্যা—এ ধরনের ছোট অভ্যাস মনকে সতেজ করতে এবং দৈনন্দিন চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে।

সবুজ পরিবেশের সঙ্গে মানুষের ঘুমের মান, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগেরও সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে হাঁটার উপযোগী উদ্যান ও উন্মুক্ত স্থান মানুষের শরীরচর্চার সুযোগ বাড়ায়, যা মানসিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের বিকাশে সবুজ পরিবেশের গুরুত্ব

শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে প্রকৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গাছপালার মধ্যে খেলাধুলা, খোলা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ শিশুদের মনোযোগ, কৌতূহল ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করতে পারে।

প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় পরিচয় শিশুদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। একই সঙ্গে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার মতো কাজে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ এবং জীবজগতের প্রতি যত্নশীল মনোভাব তৈরি হতে পারে।

তাই শিশুদের শুধু ঘর কিংবা পর্দাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরাপদ সবুজ পরিবেশে খেলাধুলা ও সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া জরুরি।

প্রবীণদের একাকিত্ব কমাতেও সহায়ক

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ শারীরিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক যোগাযোগের অভাব কিংবা একাকিত্বের মুখোমুখি হন। এ ক্ষেত্রে সবুজ উদ্যান ও খোলা পরিবেশ তাদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

নিরাপদ পরিবেশে নিয়মিত হাঁটাচলা, গাছের ছায়ায় বিশ্রাম এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ প্রবীণদের শারীরিক সক্রিয়তা ও মানসিক ভালো থাকার অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে। তবে তাদের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে প্রকৃতিনির্ভর নগর পরিকল্পনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নগরজীবনে প্রকৃতির উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাপানের বনস্নান পদ্ধতি থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুরের নগর পরিকল্পনায় সবুজায়নের উদ্যোগ—এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।

শহরের ছাদবাগান, উল্লম্ব বাগান, সড়কের পাশে গাছ লাগানো এবং উন্মুক্ত উদ্যান সংরক্ষণ নগর পরিবেশকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ মানুষের প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার সুযোগ বাড়ায়।

দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে যুক্ত করবেন প্রকৃতিকে

মানসিক প্রশান্তির জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুললেই প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো সম্ভব।

  • ঘরে গাছ লাগান: ঘরের ভেতরে কিংবা বারান্দায় উপযোগী টবে গাছ লাগিয়ে পরিচর্যা করুন।

  • পার্কে সময় কাটান: সুযোগ পেলেই কাছের কোনো উদ্যান বা সবুজ এলাকায় হাঁটুন।

  • ছাদবাগান গড়ে তুলুন: বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় ছোট বাগান তৈরি করুন।

  • শিশুদের উৎসাহিত করুন: ছোটবেলা থেকেই শিশুদের গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় যুক্ত করুন।

  • প্রকৃতির জন্য সময় রাখুন: প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় খোলা পরিবেশে কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।

নগরায়ণ ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা যত বাড়ছে, মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সবুজ পরিবেশের প্রয়োজনীয়তাও তত স্পষ্ট হচ্ছে। গাছ কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, মানুষের মানসিক প্রশান্তি অর্জনের সুযোগও তৈরি করে।

আরও পড়ুন