
নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পর্যবেক্ষণ করা ৭০ আসনের ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশে ভোটারদের হুমকি, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক ভোটারকে প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করা, ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোটের ঘটনা থাকলেও টিআইবি বলছে, নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর উপাদান দেখা যায়নি। মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে।
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনের পর কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, নির্বাচনে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে। টিআইবির বরাতে একই দাবি করেন জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ অনেকে।
যদিও সংবাদ সম্মেলনেই ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট করেছিলেন, ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েনি। বরং টিআইবির পর্যবেক্ষণ করা ৭০টি আসনের ২১ দশমিক ৪ শতাংশে এক বা একাধিক জাল ভোটের ঘটনা পাওয়া গেছে।
পরে টিআইবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পুরো নির্বাচনে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ভুল, ভিত্তিহীন ও অমূলক।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, অনিয়মও হয়েছে
আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে কিনা– প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ছিল। তাই বলা যায়, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নমুনায়ন পদ্ধতিতে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন বেছে প্রতিবেদন তৈরি করেছে টিআইবি। এতে ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই ৫৮টি আচরণবিধির কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন।
নির্বাচনের দিনও অনিয়ম হয়েছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর ওপর হামলা, কেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা, বানোয়াট নিয়মের অজুহাতে ভোটারদের হেনস্তা, একজনের ভোট আরেকজনের দেওয়া, ভোটের সময় টাকা বিতরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটের পর পর্যবেক্ষণ করা ৭০ আসনে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ১২৫টি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, প্রতিপক্ষের ভোটার-কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি, বাড়িঘর-অফিসে হামলা হয়েছে ১৮টি, একই দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি।
টিআইবির প্রতিবেদনে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছে।
১৩ জন শত কোটিপতি, অর্ধেক ঋণী
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নবনির্বাচিত ২৯৭ এমপির ২৩৬ জন কোটিপতি। শত কোটিপতি এমপি ১৩ জন। শীর্ষ ১০ জনের একজন বাদে সবাই বিএনপির। ৬০৭ কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন ফেনী-৩ আসনের নবনির্বাচিত এমপি আবদুল আউয়াল মিন্টু।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ নতুন এমপির ব্যাংক ঋণ রয়েছে। বিএনপির ৬২ শতাংশ এমপির ব্যাংক ঋণ আছে। জামায়াতের ১৬ শতাংশ এমপি ঋণগ্রস্ত। নবনির্বাচিত এমপিদের কাছে ব্যাংকের পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ টাকা। শীর্ষ ১০ ঋণগ্রস্তের সবাই বিএনপির এমপি। হবিগঞ্জ-৪ আসনের এমপি এস এম ফয়সালের কাছে ব্যাংকের পাওনা দুই হাজার ৪২ কোটি টাকা।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করে আটজন প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। পাঁচজন এমপি বিদেশে সম্পদের তথ্য দিয়েছেন বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
৯৯% প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘন
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আচরণবিধি রক্ষায় রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনো নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙেছেন। অনলাইন ও অফলাইন প্রচারণায় খরচের সীমা বিএনপি ও জামায়াত লঙ্ঘন করেছে। বিএনপির ব্যয় নির্ধারিত সীমানার ৩২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। জামায়াতের ক্ষেত্রে তা ৩১৫ দশমিক ২ শতাংশ। বিএনপি প্রার্থীরা গড়ে এক কোটি ৮৯ লাখ টাকা খরচ করেছেন। জামায়াত প্রার্থীরা খরচ করেছেন এক কোটি ১১ লাখ টাকা। যদিও নির্বাচনী ব্যয়সীমা ছিল গড়ে ৪৪ লাখ টাকা।
কমেছে নারী, বেড়েছে নতুন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। মাত্র সাতজন নারী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। নবম সংসদে ১৪, দশম সংসদে ২০, একাদশ সংসদে ২২ এবং দ্বাদশ সংসদে ২০ জন নারী এমপি ছিলেন।
টিআইবি জানিয়েছে, নবনির্বাচিত এমপিদের গড় বয়স ৫৯ বছর, যা আগের সংসদগুলোর তুলনায় কম। প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন ২০৯ এমপি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জয়ী হতেই হবে– এ চর্চা ছিল এবারের নির্বাচনে। অর্থ, ধর্ম ও পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির অপব্যবহার হয়েছে, যা সাধারণ ভোটারের মধ্যেও এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করে। ফলে ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই ভোট অনেক দেশের চেয়ে ভালো মনে হলেও বাংলাদেশের মানদণ্ডে আশাপ্রদ নয়।
টিআইবি বলেছে, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ঘাটতি ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো অসহযোগিতাই বেশি করেছে। প্রধান দুই প্রতিপক্ষই কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে, যা পরোক্ষভাবে কমিশনের নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টারই একটি ইঙ্গিত হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, সহকারী কোঅর্ডিনেটর রিফাত রহমান, পরিচালক মোহাম্মদ প্রমুখ।





