
কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া এসব তথ্য জানান। চালকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এর আগে নিহত শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে তাজমিন। তবে পদুয়ার বাজার এলাকা থেকে শহরের দিকে না গিয়ে চালক তাকে নিয়ে অন্য পথে বিজরার দিকে রওনা হন। পরে বিভিন্ন সড়ক ঘুরিয়ে তাকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে সে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ সময় দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশে ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। পরে কিশোরী পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও অভিযুক্তের কবল থেকে রক্ষা পায়নি।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন স্বীকার করেছে, ওই স্থানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর নিজের গামছা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে সে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর সুমন পাশের একটি পুকুরে গোসল করে এবং তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে নেয়। পরে মুঠোফোনটি স্থানীয় একটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে অটোরিকশাটি ফেলে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ছায়া তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধানখেত থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সুমন ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না, তা আসামিকে আদালতে উপস্থাপনের পর জানা যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার, উপপরিদর্শক অর্ণবসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশেই পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে স্বজনরা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। তার বাবা রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করায় পরিবারের সঙ্গে নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সর্বশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়।
পরে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি বার্তা পাঠায় তাজমিন। তবে গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় তার বাবা সময়মতো বার্তাটি দেখতে পারেননি।
পরদিন সকালে লালমাইয়ের ধানখেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে স্বজনরা সেখানে গিয়ে তাজমিনকে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।









