
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
এখন ভোটারদের দায়িত্ব সঠিকভাবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করা। প্রতিটি ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ও পরে কিছু বিষয় জানা জরুরি। ভোট দিতে কী তথ্য প্রয়োজন, কীভাবে ভোট দেবেন, কীভাবে ব্যালট ভাঁজ করবেন এবং নির্দিষ্ট ব্যালট বাক্সে ফেলবেন—এসব বিষয়ে ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে যা জানা প্রয়োজন
১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট দিতে যাওয়ার আগে আপনার সঠিক ভোটকেন্দ্র এবং ভোটার তালিকার ক্রমিক নম্বর জানা থাকলে সময় বাঁচবে এবং বিভ্রান্তি এড়ানো যাবে।
পদ্ধতি-১: স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি অ্যাপ
ভোটাররা স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানতে পারবেন। এ জন্য ভোটারকে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপ ডাউনলোড করে ইনস্টল করতে হবে। অ্যাপ ইনস্টলের পর ড্যাশবোর্ড থেকে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ অপশনটি সিলেক্ট (নির্বাচন) করতে হবে। ‘ভোটকেন্দ্র খুঁজুন’ অপশনে ক্লিক করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর ও জন্মতারিখ ইনপুট দিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। অনুসন্ধানে ভোটার নম্বর, ভোটার ক্রমিক নম্বর, ভোটকেন্দ্রের নাম ও কেন্দ্রের ঠিকানা প্রদর্শিত হবে।
পদ্ধতি-২: হটলাইন নম্বর
বাংলাদেশের যেকোনো ভোটার ১০৫ হটলাইন নম্বরে কল করে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানতে পারবেন। এ জন্য হটলাইন নম্বরে (১০৫) কল করার পর অপারেটরের সঙ্গে কথা বলতে ৯ চাপতে হবে। এ পদ্ধতিতে তথ্য জানতে ভোটারের এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ প্রয়োজন হবে। এ জন্য এসব তথ্য হাতে নিয়ে হটলাইন নম্বরে (১০৫) কল করতে হবে। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত এ সেবা চালু থাকবে।
পদ্ধতি-৩: এসএমএস সেবা
খুদে বার্তা বা এসএমএসের মাধ্যমে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানা যাবে। এ জন্য মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে ‘পিসি এনআইডি’ (PC NID) লিখে ১০৫ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে।
পদ্ধতি-৪: নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইট থেকে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানা যাবে। এ জন্য ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা মোবাইলের যেকোনো ব্রাউজার থেকে ইসির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। ওয়েবসাইটের ‘ভোটকেন্দ্র’ মেনুতে ক্লিক করলে ভোটকেন্দ্র অনুসন্ধানের অপশন পাওয়া যাবে। ওয়েবসাইটে দুটি উপায়ে ভোটকেন্দ্র খোঁজা যাবে। প্রথমত, নির্বাচনী এলাকা বা উপজেলা/থানা সিলেক্ট (নির্বাচন) করে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের তালিকা দেখা যাবে। দ্বিতীয়ত, এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে অনুসন্ধান করলে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানা যাবে।
ভোট দিতে যাওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে রাখা ভালো, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। ভোটার তালিকায় নাম ও ছবি থাকলে এবং পোলিং অফিসার পরিচয় নিশ্চিত করতে পারলে ভোট দেওয়া যাবে।
মনে রাখতে হবে, কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ বা অস্ত্র নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া
ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের পর প্রথমে পোলিং অফিসার আপনার নাম ও ক্রমিক নম্বর যাচাই করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে বা অন্য কোনো আঙুলে অমোচনীয় কালির দাগ দেওয়া হবে।
এরপর প্রিজাইডিং অফিসার বা পোলিং অফিসার আপনাকে দুটি ব্যালট পেপার দেবেন—একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি গণভোটের জন্য। ব্যালট পেপারের পেছনে অবশ্যই অফিসিয়াল সিল ও প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর আছে কি না তা দেখে নিতে হবে।
ব্যালট নিয়ে নির্ধারিত গোপন কক্ষে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের ওপর রাবার স্ট্যাম্প দিয়ে স্পষ্টভাবে সিল দিতে হবে। গণভোটের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যালটে হ্যাঁ বা না ভোট দিতে হবে।
সিল দেওয়ার পর ব্যালট এমনভাবে ভাঁজ করতে হবে যাতে কালি অন্য কোনো প্রতীকের ওপর না লাগে। সাধারণত লম্বালম্বিভাবে ভাঁজ করা নিরাপদ।
ভাঁজ করা ব্যালট পেপার সংশ্লিষ্ট স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ফেলতে হবে এবং অযথা দেরি না করে দ্রুত কেন্দ্র ত্যাগ করতে হবে।
সনাতন পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে না। ভোট হবে সম্পূর্ণ সনাতন পদ্ধতিতে—অর্থাৎ কাগজের ব্যালট ও ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে। ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট’ অ্যাপসহ অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কেবল তথ্য আদান-প্রদান ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হবে, ভোট দেওয়ার জন্য নয়।
নির্বাচন সংক্রান্ত সার্বিক চিত্র
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ২৯৯ সংসদীয় আসনে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। মোট প্রার্থী ২ হাজার ৩৪ জন, এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে—এমন প্রত্যাশার মধ্যেই দেশের প্রথমবারের মতো একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এখন দায়িত্ব ভোটারদের—সচেতনভাবে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা।










