
ঐতিহাসিক গণভোটে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে পাস হয়েছে নতুন ‘জুলাই সনদ’। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এ গণভোটের রায়ে দেশের সংবিধানে ৪৭টি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭।
নতুন সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে রাষ্ট্র কাঠামো, নাগরিক অধিকার, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, বাংলার পাশাপাশি দেশে প্রচলিত সব মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাবে। এছাড়া নাগরিক পরিচয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে—“বাঙালি” নয়, জাতীয়তা হবে “বাংলাদেশি”।
এখন থেকে সংবিধান পরিবর্তনে কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হবে না। নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধান রাখা হয়েছে।
আগের চার মূলনীতির পরিবর্তে সামাজিক সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞাও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে সব ধর্মের মানুষের মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই হবে এর লক্ষ্য।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে এবং কোনো সরকার ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে পারবে না। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের নেতাদের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে। তাকে অপসারণে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানে ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্মতি প্রয়োজন হবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হবে, তবে তা গঠিত হবে শাসক দল ও দুই বিরোধী দলের ঐকমত্যে।
সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০ আসন, যা আনুপাতিক ভোটে বণ্টিত হবে। নিম্নকক্ষে নারীদের সংরক্ষিত আসন ধাপে ধাপে ১০০-তে উন্নীত করা হবে। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন সংসদ সদস্যরা।
বড় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চুক্তিতে দুই কক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে সংসদ গঠিত বিশেষ কমিটির হাতে ন্যস্ত হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে তদারকি কাঠামো থাকবে।
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে। আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা নির্ধারণ ও হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগে প্রধান বিচারপতির ভূমিকা থাকবে। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার লক্ষ্যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা এবং অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার প্রস্তাব রয়েছে।
ন্যায়পাল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজনের প্রস্তাবও রয়েছে।
স্থায়ী ও স্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। বর্তমান পিএসসিকে সাধারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই তিন ভাগে বিভক্ত করার চিন্তাও রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে নতুন করে কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের প্রস্তাব যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, গণভোটে অনুমোদিত এই ৪৭ সংশোধনী কার্যকর হলে দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের দিকে নজর সবার।








