বুধবার ৭ অক্টোবর, ২০২৬

এক অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নামতে পারেন ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ: বিশ্বব্যাংক

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - 62 million people could fall below the poverty line due to a single economic shock- World Bank
ছবি: এআই/রাইজিং কুমিল্লা সম্পাদিত

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি সমস্যার কারণে বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমানোর সাম্প্রতিক অগ্রগতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ আবারও দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি বছরে এ হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও সে অনুযায়ী মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কাজের সময় কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমার পাশাপাশি বিদ্যমান চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ অর্থবছরের পর নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। শ্রমবাজারে নারীদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য না থাকায় মোট কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।

দরিদ্র মানুষের সুরক্ষায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও এর সুবিধা যথাযথভাবে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বর্তমানে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশই এসব সুবিধার বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের একটি অংশও সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পাচ্ছে।

বিদ্যুৎ ভর্তুকির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। শহরের তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলো ভর্তুকির বড় অংশ পেলেও দরিদ্র পরিবারগুলোর অংশ তুলনামূলক কম।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, কোনো বিকল্প সহায়তা ব্যবস্থা ছাড়া বিদ্যুৎ ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হলে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন।

তবে দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

পরিবারভিত্তিক সহায়তা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা এবং সমন্বিত খাদ্য সহায়তা আরও কার্যকরভাবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে দারিদ্র্যের হার কয়েক দশমিক পয়েন্ট পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকি ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

আরও পড়ুন